বাজেট ২০২৬-২৭: স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব

জাতীয় স্লাইড

 

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। এতে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন ব্যয় কমানো হয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অর্থ বিভাগের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও সর্বজনীন সুরক্ষার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও ভর্তুকির চাপ বিবেচনায় এনে ব্যয় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে মোট ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই বৃদ্ধি সরকারের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ হিসাবে দেখা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকার তুলনায় ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কম। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ব্যয়ের ১০টি খাতের জন্য মোট ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এসব খাতে বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এই খাতগুলোতে মোট বরাদ্দ বাড়ছে ৩০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এই তালিকায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এ খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। অপরদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেতে যাচ্ছে। এর পরিমাণ ১২ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া অন্য বড় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে-স্থানীয় সরকার বিভাগে ৪৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগে ৩৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩১ হাজার ১০ কোটি টাকা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ে ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পেছনে সরকারের একটি বড় পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য সংস্কারের অংশ হিসাবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দুটি উদ্যোগকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে জনগণের নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহনের হার অনেক বেশি। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বড় আকারে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত। তিনি আরও বলেন, ই-হেলথ কার্ড ও জাতীয় স্বাস্থ্যবিমার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়বে এবং ব্যয় কাঠামো আরও স্বচ্ছ হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বরাদ্দ কমানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে ভর্তুকি কমানোর প্রক্রিয়াটি ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে করতে হবে, যাতে শিল্প ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ব্যয় কমানোর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। দেশে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে, যা বাজেট বরাদ্দে প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটে গ্যাস, কয়লা ও তেল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, এই বাজেট প্রস্তাব মূলত অগ্রাধিকারের একটি কৌশলগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। তিনি জানান, সরকার ধীরে ধীরে অবকাঠামোকেন্দ্রিক ব্যয় থেকে মানবসম্পদ উন্নয়নমুখী ব্যয়ের দিকে সরে আসছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিদ্যুৎ খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *