কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ব্যক্তিগতভাবে একটি প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছিলেন, তা হলো– কে আগে পিছু হটবে। দিনের পর দিন ওয়াশিংটন ও মস্কো একে অপরকে চাপে রেখেছিল। আবার উভয় পক্ষই সতর্ক ছিল, পিছু হটলে পরে আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেই একই যুক্তি এখন হরমুজ প্রণালির ওপর ঝুলছে।
সিএনএন লিখেছে, ইরান কার্যকরভাবে প্রণালিটি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ঘোষণা করেছে, জাহাজগুলোকে তাদের জলসীমার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং ট্রানজিট ফি দিতে হবে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ দিয়েছে। ওয়াশিংটনের কৌশল হলো, বিশ্ব যদি আগের মতো প্রণালিটি ব্যবহার করতে না পারে, তবে ইরানও তা ব্যবহার করতে পারবে না।
দুই পক্ষের চাপের মুখে একটি অনির্দিষ্টকালের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। তবে সামনে কয়েকটি বিকল্প পথ রয়েছে।
স্থিতাবস্থা মেনে নেওয়া
উভয়পক্ষ অনড় থাকায় স্বাভাবিক ফল হবে– ‘হরমুজের স্থিতাবস্থা’ তাদের মেনে নিতে হবে। ইরানের নেতারা প্রয়োজনে দেশকে অর্থনৈতিক পতনের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিতেও প্রস্তুত। তেহরানের এই দৃষ্টিভঙ্গির যুক্তি আছে। কারণ ইরানের নেতারা আদর্শবাদী। তারা মধ্যপ্রাচ্যকে মার্কিন প্রভাবমুক্ত করতে চায়।
পাশাপাশি ইসরায়েলকে মোকাবিলা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটাও সত্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সময়ের সঙ্গে আরও জটিল হবে। এতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে ভুগবে ইরান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে বলে দেখাচ্ছেন। কিন্তু হরমুজ বন্ধ থাকলে সময়ের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপও বাড়বে– এটাই বড় সত্য। এটা ওয়াশিংটনকেও আঘাত করবে। অন্যদিকে তেহরান বিশ্বাস করে, ট্রাম্প কয়েক বছর পর আর ক্ষমতায় থাকবেন না।
ছাড় দেওয়ার মানসিকতা
কূটনীতিতে সফলতার জন্য আপস প্রয়োজন। এই মুহূর্তে ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই তা করতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে না। উভয় পক্ষই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পরিবর্তে একে অপরের ইচ্ছাশক্তি ভেঙে দেওয়ার দিকেই মনোনিবেশ করেছে। ইরান প্রণালিটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করেছে এবং টোলের দাবি থেকে সরে আসতে অস্বীকার করেছে। এই নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে ব্যর্থ জাহাজগুলোর ওপর তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই নীতিতে ছাড় দিতে পারে। ট্রাম্প এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ‘হরমুজ মার্কিন স্বার্থের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়’। কিন্তু বাস্তবে এ কথা আদৌ সত্য নয়।
সামরিক পদক্ষেপ
হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হবে। ইরানও দীর্ঘ যুদ্ধের পথ বেছে নেবে– এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে শুধু পানিতে মাইন স্থাপন নয়; হরমুজ রক্ষায় তারা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে দুবার ভাববে না। এমনকি প্রণালিটির দিকে মুখ করে থাকা পর্বতমালা থেকেও তারা হামলা চালাতে পারবে। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের হুমকি কমবে না।
আপাতত এক নতুন স্বাভাবিকতা
হরমুজ অদূর ভবিষ্যতে কার্যত বন্ধই থাকতে পারে। তাৎক্ষণিক সংকট কমে গেলেও প্রণালিটির মধ্য দিয়ে নৌচলাচলের স্বাধীনতা আর কখনোই হয়তো আগের মতো ফিরবে না। এটা হয়ে উঠতে পারে এক নতুন বাস্তবতা। উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই হরমুজ এড়িয়ে পূর্ব-পশ্চিম অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবস্থা কৌশলগতভাবে মূল্যবান প্রমাণিত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর বৈশ্বিক জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


