আসন্ন জাতীয় বাজেটে সরকার সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হারে সম্পদ কর পুনরায় চালুর কথা বিবেচনা করছে। বর্তমানে চালু থাকা সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এই নতুন করব্যবস্থা চালু করলে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য অর্জন করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন বাজেটের আয়কর কাঠামো নিয়ে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবেই প্রস্তাবিত এই সম্পদ কর বিষয়টি উঠে এসেছে। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তাদের মধ্যে সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আলোচনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, করদাতাদের ঘোষিত নিট সম্পদের ওপর বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সরাসরি সম্পদের ওপর কর আরোপ করা হবে। তবে সম্পদের মূল্য নির্ধারণের জটিলতার কারণে প্রাথমিকভাবে করদাতার ট্যাক্স ফাইলে ঘোষিত নিট সম্পদের ভিত্তিতেই এই কর নির্ধারণ করা হতে পারে।
কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যতে সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণের জন্য ধাপে ধাপে একটি কার্যকর পদ্ধতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন সফলভাবে চালু করা গেলে প্রস্তাবিত সম্পদ কর থেকে রাজস্ব আদায় কয়েকগুণ বাড়তে পারে। গত মাসে বাজেট-সংক্রান্ত আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানও সম্পদ কর পুনরায় চালুর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন। বাংলাদেশে প্রথম ১৯৬৩ সালে ‘ওয়েল্থ ট্যাক্স অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে এ কর ব্যবস্থা চালু হলেও মূল্যায়ন জটিলতা ও দ্বৈত করের আশঙ্কায় ১৯৯৯ সালে তা বাতিল করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সংস্থা ক্রমবর্ধমান বৈষম্য কমাতে আবারও সম্পদ কর চালুর সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন জটিলতা ও মূল্য নির্ধারণের সমস্যার কারণে উদ্যোগগুলো এখনো বিলম্বিত রয়েছে।
প্রস্তাবিত কর কাঠামো
একজন এনবিআর কর্মকর্তার মতে, প্রস্তাবিত করের আওতায় ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত থাকতে পারে, যা বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থার মতোই। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি টাকার সম্পদের ওপর ০.২৫ শতাংশ কর, পরবর্তী ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৫০ শতাংশ, এরপরের ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপ করা হতে পারে। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবটি এখনও বিবেচনাধীন। বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার আগে আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন—নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ায় এমন কোনো বাজেট ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ১১ জুন সংসদে উপস্থাপন করা হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের সমর্থন, তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্কতা
দেওয়া বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাবকে মোটামুটি ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, বৈষম্য বাড়তে থাকায় বাংলাদেশে আরও শক্তিশালী পুনর্বণ্টনমূলক করনীতি প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সম্পদ বণ্টনে উচ্চ বৈষম্যের দিকে এগোচ্ছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে।তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে সম্পদের সুষম বন্টন ও ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য কমাতে বাড়তি সম্পদের ওপর কর আরোপ করার উদ্যোগ যৌক্তিক।’
এই অর্থনীতিবিদ বিদ্যমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, এটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে নয়। তিনি বলেন, ‘অনেক দেশ আয়করের সঙ্গে যুক্ত সারচার্জের পরিবর্তে সরাসরি সম্পদ কর আরোপ করে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সম্পদের মূল্যায়ন বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত এনবিআর সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নতুন কর ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে নিয়ম মেনে সম্পদ ঘোষণা করা করদাতাদের ওপর বেশি চাপ পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি ১ হাজার কোটি টাকার বদলে ৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায়, তাহলে চাপ মূলত নিয়মিত করদাতাদের ওপরই পড়বে।’ তিনি বলেন, কর ফাঁকি দেওয়া বা সম্পদ গোপনকারীরা এতে তেমন প্রভাবিত হবে না, যদি না নজরদারি ও তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা উন্নত করা হয়। তিনি আরও বলেন, যাদের বিপুল সম্পদ আছে কিন্তু আয় কম—তাদের ক্ষেত্রে কর দিতে গিয়ে কি সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হতে হবে, এ প্রশ্নও বিবেচনা করা উচিত।
যেসব কারণে সরকার বেশি রাজস্ব আশা করছে
বর্তমানে দেশে সম্পদ সারচার্জ সরাসরি সম্পদের ওপর আরোপ করা হয় না; বরং আয়করের পরিমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, যার হার সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত যেতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তির ১০০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও যদি তার বার্ষিক আয়কর ২০ লাখ টাকা হয়, তাহলে বর্তমান ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ সারচার্জ দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা। কিন্তু সরাসরি ১ শতাংশ সম্পদ কর চালু হলে একই সম্পদের ওপর কর দিতে হবে ১ কোটি টাকা। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১১ হাজারের কিছু বেশি করদাতা এই সারচার্জ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন। তবে তথ্য আদান-প্রদান এবং করদাতা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।


