কুমিল্লায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)-এর মৃত্যু ঘিরে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচ সদস্যের একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বুলেট বৈরাগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। মা-বাবা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাসন্তানকে রেখে এমন মর্মান্তিকভাবে তাঁর চলে যাওয়া অনেকের কাছেই মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনরা তাঁকে স্মরণ করে শোকবার্তা ও স্মৃতিচারণমূলক পোস্ট দিচ্ছেন।
রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে মরদেহ গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিহতের স্ত্রী ঊর্মি হীরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমি আর কিছু জানতে চাই না, শুধু জানতে চাই—আমার স্বামীর সঙ্গে কী হয়েছিল।” তাঁর এই আকুতি উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে ঘটনাটির একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড। পাঁচ সদস্যের একটি ছিনতাইকারী চক্র যাত্রী সেজে ফাঁদ পেতে বুলেট বৈরাগীকে টার্গেট করে। পরে তাঁকে লুটপাটের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, আটক পাঁচজন হলেন—ইমরান হোসেন হৃদয় (৩৭), মোহাম্মদ সোহাগ (৩০), ইসমাইল হোসেন জনি (২৫), মোহাম্মদ সুজন (৩২) এবং রাহাতুল রহমান জুয়েল (২৭)। তারা সবাই কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এদের বিরুদ্ধে আগেও মাদক ও ছিনতাইসহ একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন বুলেট বৈরাগী। রাত প্রায় পৌনে ৩টার দিকে তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি পয়েন্টে বাস থেকে নামেন। সেখান থেকে নিজের বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তবে ওই সিএনজিতে আগে থেকেই যাত্রীবেশে অবস্থান করছিল ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা।
সিএনজিতে ওঠার কিছুক্ষণ পরই তারা বুলেট বৈরাগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন, ব্যাগ, ক্যামেরা, এমনকি পায়ের জুতাও ছিনিয়ে নেয়। এরপর তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং একপর্যায়ে চলন্ত সিএনজি থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। গুরুতর আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পরদিন শনিবার সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। মরদেহের মাথার পেছনে ও মুখমণ্ডলে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকা থেকে একজনকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয় এবং চালককেও আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের কাছ থেকে নিহতের মোবাইল ফোনসহ ছিনতাই হওয়া কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
বুলেট বৈরাগী কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের একজন কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডারের মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগ দেন। চাকরির সুবাদে কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকায় তাঁর বাড়ি। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
তাঁর মা নীলিমা বৈরাগী জানান, অনেক কষ্ট করে তাঁরা ছেলেকে মানুষ করেছেন। ছেলে কখনো কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত না। ঘটনার রাতে ছেলের সঙ্গে তাঁর একাধিকবার কথা হয়। শেষবার ভোররাতের দিকে ফোনে কথা বলার সময় ছেলের কণ্ঠে অস্বাভাবিকতা টের পান তিনি। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হলেও আটক পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ রোববার বিকেলে টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পারিবারিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে রাতেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মাত্র তিন দিন আগে ছিল তাঁর বিবাহবার্ষিকী। ২০২২ সালে তিনি বিয়ে করেন ঊর্মি হীরাকে। তাদের এক বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে—অভয় বৈরাগী।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, সোমবার ছিল তাঁর সন্তানের প্রথম জন্মদিন। সেই আনন্দঘন মুহূর্তকে ঘিরেই দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য রওনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—সেই সন্তান জন্মদিনে বাবাকে আর ফিরে পেল না।
কাস্টমস কার্যালয়ের সামনে মরদেহ আনা হলে সহকর্মী ও স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্ত্রী ঊর্মি বারবার আহাজারি করে বলেন, “ও বুলেট, আমাকে কোথায় রেখে গেলে? আমি কীভাবে বাঁচব?” অন্যদিকে, বাবা সুশীল বৈরাগী ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলেন, ছেলেকে ঘিরে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সবকিছু মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।


