যেভাবে হত্যার শিকার হন রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী

অর্থনীতি স্লাইড

কুমিল্লায় ছিনতাইকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই পেশাদার ছিনতাইকারী বলে জানিয়েছে র‌্যাব, যাদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১১ এর উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, গত ২৪ এপ্রিল গভীর রাতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং পরদিন সকালে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই র‌্যাব গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করে এবং অভিযান চালিয়ে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে কুমিল্লা এলাকায় সক্রিয় ছিনতাইকারী চক্রটি ভোররাত প্রায় ৩টার দিকে বুলেট বৈরাগীকে টার্গেট করে। বাস থেকে নামার পরপরই তারা তাকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়। এরপর চলন্ত অবস্থায় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। গুরুতর জখম অবস্থায় একপর্যায়ে তাকে সিএনজি থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিহত বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) এর মাধ্যমে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরীর রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় বসবাস করতেন।

কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান জানান, বুলেট বৈরাগী সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে গত ১১ এপ্রিল সেখানে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ এপ্রিল রাতে তিনি ঢাকায় ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। রাত প্রায় ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে একটি ঢাকাগামী বাসে ওঠেন তিনি। যাত্রাপথে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার।

সবশেষ রাত ১টা ২৫ মিনিটে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তিনি জানান যে, তিনি কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পরিবার সদস্যরা বিভিন্নভাবে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

পরদিন শনিবার সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তার মরদেহ। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত হাইওয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়।

এ ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে। র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে এবং ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তারা আরও জানান, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় ছিল এবং গভীর রাতে যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাই করত। সুযোগ পেলে তারা নৃশংস হামলাও চালাত। বুলেট বৈরাগীর হত্যাকাণ্ডও তাদের একই ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের অংশ।

এদিকে একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এ ঘটনায় জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে এবং এ ধরনের অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *