২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের আভাস দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর কাঠামোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহজ এবং বাস্তবসম্মত করতে ন্যূনতম করের হার কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নতুন করদাতা তৈরি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এনবিআরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে প্রচলিত ন্যূনতম করের হার ৩ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে দেশের বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বল্প আয়ের উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিরা সহজেই কর ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। তবে বাস্তবতা হলো, এই বিশাল অংশ এখনও কর ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ী, হকার, ক্ষুদ্র মুদি দোকানদার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনলাইন উদ্যোক্তাদের অধিকাংশ লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয়, যা সরকারের রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ন্যূনতম কর কমিয়ে আনা হলে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হবে। বর্তমানে অনেকেই ৩ হাজার টাকা ন্যূনতম করকে তুলনামূলক বেশি মনে করে কর ব্যবস্থার বাইরে থাকতে চান। কিন্তু ১ হাজার টাকার মতো একটি কম হার নির্ধারণ করা হলে তারা স্বেচ্ছায় কর নেটের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং রাজস্ব আহরণের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
এদিকে, উত্তরাধিকার কর নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর নতুন কোনো কর আরোপের পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এই ধরনের কর চালুর সময় এখনো আসেনি।
রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দিচ্ছে এনবিআর। সংস্থাটি মনে করছে, প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি হবে। এ লক্ষ্যে ‘ই-টিডিএস’ (ইলেকট্রনিক ট্যাক্স ডিডাকশন অ্যাট সোর্স) ব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী ‘রেভিনিউ মেশিন’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎসে কর কর্তনের তথ্য সরাসরি করদাতার আয়কর রিটার্নে যুক্ত হয়ে যাবে। ফলে করদাতাদের আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ বা হিসাব করার ঝামেলা কমবে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের জন্যও তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ সহজ হবে।
এছাড়া আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত করের ক্রেডিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্নে যুক্ত করার ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে। এর ফলে করদাতাদের আগের মতো জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। কর কর্মকর্তাদের ‘অ্যাসাইকুডা’ ডাটাবেজে সরাসরি প্রবেশাধিকার দেওয়ায় তারা দ্রুত তথ্য যাচাই করতে পারবেন, যা পুরো ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করে তুলবে।
ভ্যাট ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। চেয়ারম্যান জানান, দেশে ভ্যাট দেওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে আগামী দিনে ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে টিআইএন (TIN) থাকলেও যারা নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করছেন না, তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে। কর ফাঁকি কমাতে এবং সিস্টেমকে আরও কার্যকর করতে ডাটাবেসভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ন্যূনতম কর কমানোর এই উদ্যোগ স্বল্প আয়ের মানুষকে কর ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতির সুযোগ কমবে এবং রাজস্ব আহরণ আরও টেকসই হবে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন বাজেটে কর কাঠামোতে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, তা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।


