নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যার কথা বললেও, নিহত পপি সুলতানার মায়ের অভিযোগে সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন ও জমি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি। ফলে ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
সোমবার মধ্যরাতে দুর্বৃত্তরা একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করে। মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন—নমির উদ্দিনের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩২), তাঁর স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ (৯) এবং তিন বছরের কন্যা সাদিয়া আক্তার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাবিবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে শিশু পারভেজ ও সাদিয়াকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাবিবুর রহমান পেশায় গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি মান্দার চৌবাড়িয়া হাট থেকে গরু বিক্রি করে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ধারণা করা হচ্ছে, ওই টাকা লুটের উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে প্রবেশ করে এবং ডাকাতির পর পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে।এ সময় বাড়িতে থাকা স্বর্ণালঙ্কারও লুট হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে নিহত পপি সুলতানার মা সাবিনা বেগম এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিয়ের পর থেকেই আমার মেয়েকে নির্যাতন করতো। ওরা ৫ বোন মিলে আমার মেয়ে-জামাইকে মেরে ফেলেছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মেয়ের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। কয়েকদিন আগেও পপিকে মারধরের ঘটনা ঘটে এবং তা নিয়ে থানায় অভিযোগ করা হয়।
সাবিনা বেগম বলেন, ননদ শিরিনা, তার স্বামী ভুটি এবং তাদের পরিবারের লোকজন মিলে আমার মেয়েকে মারধর করে। পরে গ্রামে সালিশ হলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
জমি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাবিবুর রহমান তাঁর বাবার একমাত্র ছেলে। সম্প্রতি তাঁর বাবা পাঁচ মেয়েকে ১০ কাঠা করে জমি এবং হাবিবুরকে বাড়িভিটাসহ প্রায় ১০ বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেন।
এই জমি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। স্থানীয়দের ধারণা, এই দ্বন্দ্ব থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।
সাবিনা বেগম বলেন, আমার জামাইকে ১০ বিঘা জমি দেওয়াতেই তাদের সমস্যা। তখন থেকেই তারা হিংসা শুরু করে এবং এই পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।
তিনি আরও দাবি করেন, ডালিমা, শিরিনা, সুফি, সাহানারা ও কমেলা—এই পাঁচ বোন এবং তাদের স্বামীরা মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আমি সবার ফাঁসি চাই।
মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে সাবিনা বেগম বলেন, রাতেও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। সে বলছিল, মা, তোমার নাতি পিঠা খাবে। আমি বললাম বানিয়ে দিও। সে বললো, ‘মা, রাত হয়ে গেছে, কাল বানাবো।’ কে জানতো এটাই শেষ কথা।
নিয়ামতপুর থানার কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে এলেও পারিবারিক বিরোধসহ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এলাকায় শোক ও আতঙ্ক
ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিয়ামতপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখনো রহস্যে ঘেরা। এটি কি কেবল ডাকাতির ঘটনা, নাকি জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিশ্চিত হতে তদন্তের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সবাইকে। তবে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা ইতোমধ্যেই পুরো এলাকায় গভীর শোক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।


