চট্টগ্রাম বন্দরে তিন দিনে ক্ষতি ৩০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা

অর্থনীতি স্লাইড

 

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা বাতিলের দাবিতে টানা ছয় দিনের আন্দোলনের পর চট্টগ্রাম বন্দরে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ দুই দিনের জন্য ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।

এই অচলাবস্থার কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর একদিন পুরোপুরি অচল থাকলে ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সেই হিসাবে মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া টানা তিন দিনের পূর্ণ অচলাবস্থায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর আগে তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি থাকায়, সেই ক্ষতি যুক্ত হলে মোট ক্ষতির অঙ্ক ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বন্দর ভবন প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেন ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন। তবে এই দুই দিনের মধ্যে এনসিটি ইজারার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে রোববার থেকে আবার কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন নেতারা। ফলে শুক্রবার সকাল থেকে বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পরদিনও কার্যক্রম সচল থাকছে।

সংবাদ সম্মেলনে ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে আমরা চারটি দাবি উপস্থাপন করেছি। আমাদের প্রধান দাবি- এনসিটি চুক্তি বাতিল করা। উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে দুই দিনের মধ্যে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।’এছাড়া আন্দোলনরত কর্মচারীদের বদলি আদেশ প্রত্যাহার, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণের।

ঐক্য পরিষদের আরেক সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সরকার যদি এনসিটি চুক্তি থেকে সরে না আসে, তাহলে রোববার থেকে আবারও কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে টানা কর্মবিরতির মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরেজমিনে চট্টগ্রাম বন্দরে যান নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। বন্দর ভবনের সামনে পৌঁছালে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে তার গাড়ি আটকে যায়। পরে গাড়ি থেকে নেমে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ইব্রাহিম খোকন অভিযোগ করে বলেন, তিনি ৩২ বছর ধরে বন্দরে চাকরি করছেন, তবে বর্তমান চেয়ারম্যানের মতো কাউকে আগে দেখেননি। গত দেড় বছরে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। দেখা করতে গেলে চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না জানিয়ে আন্দোলনকারীরা বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করেন।

জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলব। চেয়ারম্যান থাকবেন না। গত দেড় বছর ধরে আপনাদের সঙ্গে কাজ করছি। আপনাদের কথা শুনব, আপনারাও আমার কথা শুনবেন।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আগামীকাল সকাল থেকেই বন্দর সচল হবে। এভাবে বন্দর বন্ধ রেখে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। চুক্তি হবেই, প্রশ্ন হলো কোন পর্যায়ে এবং কী শর্তে হবে। প্রায় তিন মাস ধরে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।’ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল বন্দর কার্যক্রম শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) কার্যক্রম গত মঙ্গলবার থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বহির্নোঙর থেকেও কোনো জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারেনি। পতেঙ্গার আরএসজিটি চিটাগং টার্মিনাল থেকেও নির্ধারিত জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এর আগে শনিবার থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি ছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে মোট ১৩৯টি জাহাজ অবস্থান করছে, যার মধ্যে ১২০টি বহির্নোঙরে আটকে রয়েছে। খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও কনটেইনারবাহী জাহাজ বেশি সংখ্যায় আটকে পড়ায় আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রমে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে জমে আছে ৩৮ হাজার ৪৫৯টি কনটেইনার, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজারটি রপ্তানি কনটেইনার। এ ছাড়া বেসরকারি ডিপোগুলোতেও ১৩ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার আটকে রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চলমান অচলাবস্থায় দেশের আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানিয়েছে, দেশের মোট আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ডিসিসিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট (টিইইউ) কনটেইনার এবং প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার এই বন্দর থেকে খালাস হয়। বন্দর একদিন পুরোপুরি অচল থাকলে ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, যা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *