শূন্য রিটার্নে বছরে ভ্যাট ফাঁকি ৬০০ কোটি টাকা: এনবিআর

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

দেশে ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অসঙ্গতি হিসেবে উঠে এসেছে শূন্য রিটার্নের প্রবণতা। নিবন্ধিত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো ভ্যাট পরিশোধ করছে না। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধুমাত্র শূন্য রিটার্নের কারণে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায়ের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৫০৬টি। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে মোট ১৩ লাখ ১২ হাজার ৮৭৫টি শূন্য রিটার্ন জমা পড়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার ১০৯টি প্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাট পরিশোধ না করেই রিটার্ন দাখিল করছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান যদি গড়ে মাত্র ৩ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিত, তাহলে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো।

এদিকে শুধু শূন্য রিটার্ন নয়, অস্বাভাবিক কম ভ্যাট দেওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। একই সময়ে শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করেছে ২০ লাখ ১৭ হাজার ৯৫২টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান কার্যত নামমাত্র ভ্যাট দিয়ে দায় সারছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই প্রকৃত লেনদেনের তুলনায় ভ্যাট প্রদানের পরিমাণ অত্যন্ত কম, যা কর ফাঁকির ইঙ্গিত দেয়।

ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শূন্য রিটার্ন জমা হয় রাজধানীর চারটি ভ্যাট কমিশনারেটে। ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত ১ লাখ ৬০ হাজার ৩০৪টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে আট মাসে শূন্য রিটার্ন জমা পড়েছে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫৬টি। এতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৪ হাজার প্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাট দেয়নি। একই সময়ে ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৮৯টি রিটার্ন জমা হয়েছে, যেখানে ভ্যাটের পরিমাণ ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটেও একই চিত্র দেখা যায়। এখানে নিবন্ধিত ১ লাখ ১৮ হাজার ২১টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে শূন্য রিটার্ন জমা পড়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ১২৭টি, যা মাসিক হিসেবে প্রায় ১৮ হাজার প্রতিষ্ঠানের সমান। এছাড়া ২ লাখ ৩০ হাজার ২১২টি রিটার্নে ভ্যাট ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ঢাকা পশ্চিম ও পূর্ব কমিশনারেটেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে প্রতি মাসে যথাক্রমে প্রায় ১৯ হাজার এবং ৮ হাজার প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এখানে নিবন্ধিত ৯৩ হাজার ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আট মাসে শূন্য রিটার্ন জমা পড়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৮৯টি। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২২ হাজার প্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাট দিচ্ছে না। একই সময়ে ৩ লাখ ৩ হাজার ৪৮২টি রিটার্নে ভ্যাটের পরিমাণ ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, কুমিল্লা ও যশোর কমিশনারেটেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এসব অঞ্চলে মাসে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে। বিশেষ করে রাজশাহী ও খুলনায় প্রতি মাসে গড়ে ১৬-১৭ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ছাড়াই রিটার্ন জমা দিচ্ছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, শূন্য রিটার্ন প্রদানকারীদের মধ্যে আমদানিকারক, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং বন্ডেড প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি। এছাড়া কর রেয়াত সুবিধা গ্রহণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানও শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকের কাছ থেকেই বড় অঙ্কের ভ্যাট আদায়যোগ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপুল পরিমাণ ভ্যাট রেয়াত গ্রহণের পরও অনেক প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিচ্ছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে শুধু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানির বিপরীতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট রেয়াত নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য কাস্টম হাউস মিলিয়ে এ অঙ্ক আরও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ পরবর্তীতে শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ পরিস্থিতিতে ভ্যাট প্রশাসনে কঠোর নজরদারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শূন্য থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে এনবিআর। সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটগুলোকে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াত সুবিধা দেওয়া হলেও তার বিপরীতে স্বচ্ছ ও তথ্যসমৃদ্ধ ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান অসম্পূর্ণ বা তথ্যহীন রিটার্ন জমা দিচ্ছে। ফলে প্রকৃত লেনদেন ও ভ্যাট পরিশোধের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল থেকে যাচ্ছে।

তাদের মতে, ভ্যাট ফাঁকি রোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে পুরো ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন। কাস্টমস, আয়কর ও ভ্যাট ডাটাবেস সমন্বয় করা গেলে সহজেই অসঙ্গতি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিভিত্তিক অডিট জোরদার এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে পারলে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, শূন্য রিটার্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ভ্যাট ফাঁকি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও এ খাত থেকে বিপুল রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *