জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পুনর্গঠন ও দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রক্রিয়াকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে সরকার। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা কাঠামোর আওতায় আনতে আগের অধ্যাদেশ পুনরায় যাচাই-বাছাই এবং নতুনভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে এবার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যমান অধ্যাদেশকে আরও কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রস্তুত করবে এই কমিটি।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের একটি ‘সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান দায়িত্ব হবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি করা এবং ভবিষ্যতে তা নতুনভাবে উত্থাপনের বিষয়ে সুপারিশ দেওয়া।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিবকেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিটিকে মূলত আগের অধ্যাদেশের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আইনগত জটিলতা, প্রশাসনিক কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আপত্তির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে। পরবর্তীতে এসব বিবেচনায় নিয়ে একটি সংশোধিত ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।
তবে প্রজ্ঞাপনে কমিটির কাজ শেষ করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে কবে নাগাদ কমিটি তাদের সুপারিশ জমা দেবে কিংবা নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
জানা গেছে, এনবিআরকে বিভক্ত করার ধারণাটি নতুন নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার আনার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনার পর রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনার কাজকে পৃথক করার সুপারিশ দেয়। তাদের মতে, একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ কারণে উন্নত দেশগুলোর আদলে পৃথক দুটি বিভাগ গঠন প্রয়োজন।
সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই পরে সরকার ‘রেভিনিউ পলিসি’ ও ‘রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি বিভাগ রাজস্ব নীতি প্রণয়ন, কর কাঠামো, শুল্কনীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দায়িত্ব পালন করবে। অন্য বিভাগ কর, ভ্যাট ও শুল্ক আদায়সহ মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তবে অধ্যাদেশ জারির পর থেকেই এনবিআরের ভেতরে নানা ধরনের আলোচনা ও বিরোধিতা শুরু হয়। বিশেষ করে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এই বিভাজনের ফলে প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্যগত কাঠামো ভেঙে যাবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে। আন্দোলন ও আপত্তির মুখে সরকার পরে অধ্যাদেশে কিছু সংশোধন আনে।
পরবর্তীতে সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে ওই অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও আপত্তি ওঠে। তাদের অভিযোগ ছিল, নতুন কাঠামোয় দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো স্পষ্ট নয় এবং এতে প্রশাসনিক ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে। ফলে পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপ দেওয়া হয়নি। ফলে সেটির কার্যকারিতা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে নতুন কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে সরকার আবারও সেই সংস্কার উদ্যোগকে সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতি ও রাজস্ব খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে এনবিআর সংস্কারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এমন বড় ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসন এবং অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয় ও আস্থা তৈরি করাও সমান জরুরি বলে তারা মনে করছেন।


