রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড। বিশেষ করে রাজধানীতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য ও বিভিন্ন সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি অংশ আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে এবং জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৩ সালে সারা দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা ছিল তিন হাজার ২৩টি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৪২টিতে। আর ২০২৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা পৌঁছে যায় তিন হাজার ৭৮৬টিতে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনার বড় অংশই সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্যে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বৃত্তরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিটন আজিমপুরের দিক থেকে দ্রুত হেঁটে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় পেছন দিক থেকে মাস্ক পরা এক ব্যক্তি এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। প্রথমে দুটি গুলি করার পর দুর্বৃত্তটি আবার তাঁর কাছে গিয়ে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি করে। টিটন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারী তাঁর মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে নিশ্চিত হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পুরো ঘটনাটি ঘটে ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে, যেখানে তখন অসংখ্য মানুষ চলাচল করছিল। গুলির শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করে।
রাজধানীতে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী তারিক সাইদ মামুনকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই মুখোশধারী হামলাকারী খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। শত শত মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের পরও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরও আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসী মামুনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল প্রকাশ্যে তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালায়। গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সেদিন গুরুতর আহত হন মামুন। তবে ঘটনাস্থলে ভুবন চন্দ্র শীল নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেও এ ধরনের সংঘবদ্ধ হামলা জনমনে ভয় তৈরি করেছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীকেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর দুই হত্যাকারী ভারতে গ্রেপ্তার হলে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর তারা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বড় ধরনের অপরাধ সংঘটনের পরও কীভাবে সন্ত্রাসীরা দেশ ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসা কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। এদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর এসব সন্ত্রাসী আবারও নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। কেউ কেউ সরাসরি মাঠে নেমেছেন, আবার অনেকে বিদেশে অবস্থান করে ঢাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। দুবাই, ভারত, থাইল্যান্ড ও সুইডেন থেকে মোবাইল ফোনে ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো স্থানীয় সহযোগীরা সরাসরি ভুক্তভোগীর কাছে গিয়ে বিদেশে অবস্থান করা ‘বড় ভাইয়ের’ সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে।
বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে। মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল ও ভাসানটেক এলাকায় মফিজুর রহমান মামুন, শাহাদাত সাধু, কিলার আব্বাস ও কিলার ইব্রাহিমের অনুসারীদের তৎপরতা বেশি। গত ১৮ এপ্রিল কাফরুলের একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাঁদাবাজি ও গুলির ঘটনায় ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের নাম উঠে আসে। পুলিশ বলছে, এই গ্রুপ দেশের বাইরে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশে কাজ করছে।
অন্যদিকে ফার্মগেট, কাওরান বাজার ও আশপাশের এলাকায় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি গ্রুপ। ওয়াসা, তিতাস, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও খামারবাড়িসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে বাদশাহ, আহাদ, সিদ্দিক ও রবিন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে বলে জানা গেছে।
মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকাতেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমনের অনুসারীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারিতে এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় ইমনের নাম সামনে আসে। যদিও পুলিশ এখনো মূল পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
বর্তমানে মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন। গত এপ্রিল মাসেই ওই এলাকায় দুই যুবককে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাড়ছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী সন্ত্রাসী গডফাদারদের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ঘটনাই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে ঘটছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তাই দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অপরাধজগতের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার এবং বিদেশে বসে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা—সব মিলিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সহিংসতা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, পলাতক সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়া বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।


