বাজেটে সিগারেটের দাম ও কর না বাড়ানোর অনুরোধ এনসিএমএ’র

অর্থনীতি স্লাইড

 

চলতি অর্থবছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল নীতির কারণে নিম্নস্তরের সিগারেটের ভোক্তা প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে এ খাত থেকে সরকারের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। নিম্নস্তরের ভোক্তা মধ্যমস্তরে স্থানান্তরিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিম্নস্তরের সিগারেট শিল্প টিকিয়ে রাখতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে দাম ও কর না বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশীয় সিগারেট কোম্পানি মালিকদের সংগঠন ন্যাশনাল সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (এনসিএমএ) এ প্রস্তাব দেয়। সংগঠনটির মতে, দাম ও কর না বাড়িয়ে অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং অন্যান্য তিনটি স্তরে দাম বৃদ্ধি করলে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব।

এনসিএমএ’র পক্ষে আবুল খায়ের গ্রুপের গ্রুপ হেড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, গত পাঁচ বছরের তথ্যে দেখা যায় সিগারেট খাত থেকে প্রতি বছরই রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ‘ডাবল ডিজিটে’ থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫ শতাংশে (সিঙ্গেল ডিজিটে) নেমে এসেছে। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাজেটে সিগারেটের দাম ও কর হঠাৎ বাড়ানোর ফলে রাজস্ব কমেছে। এতে নিম্নস্তরের সিগারেটের বিক্রি প্রায় ২২ শতাংশ কমে যায় এবং সরকারের প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়। তিনি আরও বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিগারেট খাতের মোট রাজস্বের ৫৬ শতাংশ আসত নিম্নস্তর থেকে, যা চলতি অর্থবছরে কমে ২৭ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে মধ্যস্তরের সিগারেট থেকে রাজস্ব ৫১ শতাংশে বেড়েছে, অর্থাৎ নিম্নস্তরের ভোক্তা মধ্যস্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে।

শাবাব আহমেদ বলেন, চলতি অর্থবছর নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ৫০ টাকা থেকে এক লাফে ৬০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ দাম ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গত পাঁচ বছরে অতি উচ্চস্তরের দাম ৮ দশমিক ২ শতাংশ, উচ্চস্তরে ৮ দশমিক ২, মধ্যমস্তরে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ানো হলেও একমাত্র নিম্নস্তরে প্রায় ১২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নস্তরের সিগারেটের ভোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, সিগারেট মার্কেটের ৮০ শতাংশ শলাকা হিসেবে বিক্রি হয়। নিম্নস্তরের সিগারেট ৪ থেকে ৫ টাকা থেকে বিক্রি হতে হতে এখন ৬ থেকে ৭ টাকায় চলে এসেছে। নিম্নস্তরের এক শলাকা সিগারেটের ন্যূনতম দাম ৬ টাকা। অথচ মধ্যমস্তরের এক শলাকা সিগারেটের দাম ১০ টাকা। মূল্য বিবেচনায় ভোক্তা মধ্যমস্তরে চলে গেছে। নিম্নস্তরের সিগারেটের বাজার ৭৫ শতাংশ থেকে এখন ৩৮ শতাংশে চলে এসেছে। আর মধ্যমস্তরের সিগারেটের বাজার যেখানে ১৫ শতাংশ ছিল, তা বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশ। মধ্যমস্তরে এক ভোক্তা হওয়ার কারণ হলো শলাকা প্রতি ১০ টাকা হওয়ার কারণে। যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তারা ১০ টাকা দিয়ে মধ্যমস্তরের সিগারেট খাচ্ছেন।

শাবাব আরও বলেন, সিগারেটে বর্তমান কর ৮৩ শতাংশ, যার মধ্যে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ। গত পাঁচ বছরে অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম- এই তিনস্তরের সিগারেটে রাজস্ব বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ এই তিনস্তরে ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশ হয়েছে। আর নিম্নস্তরে পাঁচ বছরে রাজস্ব বেড়েছে ১০ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্নস্তরে রাজস্ব বেড়েছে ৫ গুণ। যেসব স্তরে সরকারের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা বেশি, সেখানে রাজস্ব বেড়েছে ২ শতাংশ। আর যেখানে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা কম, সেখানে বেড়েছে ১০ শতাংশ। নিম্নস্তরের ১০ শলাকা সিগারেট বিক্রিতে আগে ম্যানুফ্যাকচারের ১১ থেকে ১২ টাকা থাকত, বর্তমানে তা ১০ টাকায় নেমেছে। আবুল খায়ের গ্রুপের এই কর্মকর্তা বলেন, অথচ অন্য তিনস্তরের সিগারেটে ম্যানুফ্যাচারের লাভ বেড়েছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের এই ভুল নীতির কারণে গুটিকয়েক কোম্পানি বাজারে থাকতে পারবে, আর ছোট কোম্পানিগুলো বাজারে থাকতে পারবে না। নিম্নস্তরের সিগারেটে এই খড়গ নামাতে সরকার প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি কোম্পানি রয়েছে। তামাক আমদানি করা হয় না, সম্পূর্ণ দেশীয় তামাক ব্যবহার করেই দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি কোম্পানি তামাক প্রসেসিং করে অন্যদের সরবরাহ করে এবং চারটি কোম্পানি সরাসরি তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানকে এনবিআরের নজরদারি ও ট্যাক্স নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে পারলে অন্তত সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে তিনি দাবি করেন। নজরদারি ও এনফোর্সমেন্ট ৫০ শতাংশ বাড়ানো গেলে কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। শাবাব আরও বলেন, সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি খুবই ধীরগতির। নিম্নস্তরের সিগারেটে দাম বেশি বাড়ানোর কারণে অবৈধ সিগারেট ও চোরাচালান বেড়েছে। তাঁর মতে, আগামী অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেট খাতকে কিছুটা ছাড় দেওয়া উচিত, কারণ দাম ও কর বাড়ালে এ খাতে ভোক্তা আরও কমে যেতে পারে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান নীতির কারণে ইতোমধ্যে ২০ থেকে ২২ শতাংশ ভোক্তা কমেছে, আবার বাড়ানো হলে তা আরও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। নিম্নস্তর থেকে যে রাজস্ব হারাচ্ছে, তা অন্য তিন স্তরে দাম বাড়িয়েও পূরণ করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন। তিনি আরও বলেন, আগামী বাজেটে অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো জরুরি। পাশাপাশি অতি উচ্চ, উচ্চ ও মধ্যম স্তরে দাম বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে আগামী অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে তিনি দাবি করেন।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, অবৈধ বিদেশি সিগারেটের বাজারে লাগাম টেনে ধরতে সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর বা এয়ার কোড অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। তখন সরকার কর বা রাজস্ব পেয়েছে কি না ভোক্তারা নিজেরাই যাচাই করতে পারবেন। সিগারেটের ওপরে থাকা ৮৩ শতাংশ ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক এবং স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আর বাড়ানো হবে না। তবে উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *