‘টিকা নিয়ে বিগত দুই সরকার ক্ষমাহীন অপরাধ করেছে’

জাতীয় স্লাইড

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সারা দেশে শিশুদের ‘হামে’র টিকা না দিয়ে গত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ। গতকাল শনিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘উপজেলা ‘উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাবসহ প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক।

এ থেকে বেরিয়ে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবু সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা পেশার গুরুত্ব যেকোনো পেশার চেয়ে বেশি এবং সরকার সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকরা রোগে-শোকে কাতর মানুষের পরম বন্ধু এবং বিপদের প্রকৃত সঙ্গী। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিভিন্ন পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়ে থাকে।

সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রণীত ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, ‘সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।’ আমেরিকার বিখ্যাত পুষ্টিবিদ প্রয়াত জ্যাক লালেনের উক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এ কারণেই যুক্তরাজ্যের এনএইচএসের জেনারেল প্র্যাকটিশনার-জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করার চিন্তা রয়েছে।’

সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে গত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।

তারেক রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য আমি চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। যাঁরা তাঁদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন সেসব মা-বাবা ও স্বজনের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন। আপনাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ এলাকার কর্মস্থলকে একটি মডেল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরিণত করবেন, আপনাদের কাছে এই প্রত্যাশা।’

উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক শোভন কুমার বশাখ, মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান, সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, সুমন কান্তি সাহা এবং তানসিভ জুবায়ের নাদিমকে কর্মদক্ষতার জন্য ক্রেস্ট দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে, প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ বক্তব্য দেন।

হাম নিয়ে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার আহবান ডিপিপিএইচের : দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। গতকাল ডিআরইউ মিলনায়তনে ‘হামে শিশুমৃত্যু : জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান ডিপিপিএইচের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা।

সম্মেলনে বলা হয়, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির বিবেচনায় অস্বাভাবিক হয়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটাকে সামাল দিতে পারে না, সেটা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি। বর্তমানে হামের বিস্তার এ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ডিপিপিএইচ মনে করছে। তাই সরকারের কাছে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার আহবান জানাচ্ছে সংগঠনটি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘মহামারি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব কাজ করছে সরকার। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল আর নিরবচ্ছিন্ন সেবার মতো উদ্যোগ নিয়েছে। বাড়তি চিকিৎসকও নিয়োগ দিচ্ছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।’

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও তাৎক্ষণিক সেটার কার্যকারিতা পাওয়া যায় না। দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।’

সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিএমএর সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক শিশুরা।’ শিশু বিশেষজ্ঞ কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুধু হামের টিকা দেওয়া হয়নি এমন নয়, হাম-পরবর্তী শিশুদের রাতকানাসহ যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

ডিপিপিএইচের সদস্যসচিব শাকিল আখতারের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন সংগঠনের সদস্য ফয়জুল হাকিম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *