সুষ্ঠু নির্বাচনের কঠিন চ্যালেঞ্জ

জাতীয় বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

আর এক মাস পর, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হবে একটি জাতীয় গণভোটও। এই যুগপৎ আয়োজন দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করলেও নির্বাচন কমিশনের সামনে তৈরি করেছে বড় ধরনের কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী প্রস্তুতি, রাজনৈতিক পরিবেশ, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে সামনে থাকা এক মাসকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী কয়েকটি দল এবারের নির্বাচনে নেই। তবে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, দলীয় অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও মাঠের চিত্র

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের জোটসঙ্গীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠে পূর্ণ প্রস্তুতিতে নেমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও আসন সমঝোতার শেষ ধাপে রয়েছে। এই জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের তুলনায় তাঁদের জোট প্রস্তুতিতে এগিয়ে রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানই ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী বলেন, “দেশের মানুষ, সরকার এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচনের দিকেই এগোচ্ছে। তবে ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গোষ্ঠী রয়েছে, যারা চায় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হোক। গুজব ছড়িয়ে জনমনে সংশয় তৈরির চেষ্টা হবে। তবুও নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে—এমন বিশ্বাস এখন জনমনে দৃঢ়।”

নির্বাচন কমিশনের আশাবাদ

গত ৮ জানুয়ারি নির্বাচন ভবনে প্রার্থীদের আপিল দায়ের কেন্দ্র পরিদর্শনকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, “দেশে কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না এবং রাজপথে নামারও দরকার হবে না।” তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সহিংসতা ও বোমাবাজির ঘটনা ঘটলেও এবার সারা দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মনোনয়ন জমা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।

সিইসি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন এখন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে প্রার্থীরা আপিল করতে আসছেন, যা নির্বাচনের প্রতি জনআস্থার প্রমাণ।

বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থী-সমর্থকদের আচরণ। কাদা ছোড়াছুড়ি ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ না হলে একটি সুন্দর নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে।” তাঁর মতে, দলগুলো যদি সদাচরণ বজায় রাখে, তাহলে সব গুজব ও আশঙ্কা উপেক্ষা করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম বলেন, বর্তমানে নির্বাচন বন্ধ করার মতো কোনো বাস্তব পরিস্থিতি নেই। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন সহিংস আন্দোলন ও জরুরি অবস্থার কারণে বাতিল হয়েছিল। “এখন তেমন সহিংস অবস্থা নেই। অধিকাংশ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, মনোনয়ন ও আপিল প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী ও সরকারও নির্বাচন চায়,” বলেন তিনি।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনা করা কমিশনের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। ভোটগ্রহণের সময় বাড়িয়ে ৯ ঘণ্টা করা হলেও সাড়ে ১২ কোটির বেশি ভোটারের মধ্যে যদি ৭০ শতাংশ ভোট দেন, তবে প্রায় ৯ কোটি মানুষকে দুটি ব্যালটে ভোট দিতে হবে। দ্রুত ভোটগ্রহণ ও নির্ভুল গণনা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

গণভোট নিয়ে উদ্বেগ

এবারের নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট। কিন্তু ভোটারদের বড় অংশ এখনো এই গণভোটের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচন বিশ্লেষক ড. রাশেদ মাহমুদ বলেন, “গণভোটের প্রশ্ন কী, এর প্রভাব কী—এ বিষয়ে যদি ভোটাররা পরিষ্কার না থাকেন, তাহলে ভোটের মান ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”

সামনে কী

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক ভূমিকা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ—এই তিনটি বিষয়ই আগামী এক মাসে নির্ধারণ করবে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে। বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতা থাকলেও সামগ্রিকভাবে দেশ নির্বাচনমুখী। সব গুজব ও শঙ্কার মাঝেও বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের বিশ্বাস—১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, যেখানে সুষ্ঠু ভোটের সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *