ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের অচলাবস্থার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরবে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার ইউএই কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ড্রোন হামলায় দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন লাগে।
একই সময়ে সৌদি আরব দাবি করেছে, তারা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইউএই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ ধরনের ‘সন্ত্রাসী হামলার’ জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার দেশটির রয়েছে। ইউএই প্রেসিডেন্টের এক কূটনৈতিক উপদেষ্টা এটিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আরো দুটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ড্রোনগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা যে তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে সেগুলো ইরাকের আকাশসীমা থেকে প্রবেশ করেছিল। দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএইয়ের আবুধাবি মিডিয়া অফিস জানায়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে প্রবেশ করা একটি ড্রোন বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে থাকা একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আঘাত হানে। এতে আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও স্বাভাবিক রয়েছে। পরে ইউএইয়ের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করে, হামলায় কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়েনি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির তৃতীয় ইউনিটে জরুরি ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশে ‘সর্বোচ্চ সামরিক সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া সংঘাতে ইরান একাধিকবার ইউএই ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও ছিল।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নৌ-মিশনের ঘোষণা দেওয়ার পর ইউএইয়ের ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে ইরান। যদিও ৪৮ ঘণ্টা পর সেই মিশন স্থগিত করা হয়।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা
সংঘাতবিরতি কার্যকর হওয়ার পাঁচ সপ্তাহ পার হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ওয়াশিংটন তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছে। বিপরীতে ইরান যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরান ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার জন্য মঙ্গলবার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবোলফাজল শেখারচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নতুন, আক্রমণাত্মক ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘অযৌক্তিক সামরিক আগ্রাসনের’ মাধ্যমে জ্বালানি বাজার অস্থিতিশীল করার দায় ইরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।
তেল সরবরাহ সংকট
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, অবরোধ কার্যকর করতে তারা ৮১টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং চারটি জাহাজ অচল করেছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, তেহরান শিগগিরই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থা ঘোষণা করবে।
সংঘাতে এরই মধ্যে হাজার হাজার ইরানি নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায়। একইভাবে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘর্ষেও বহু মানুষ নিহত হয়েছে।
শুক্রবার ইসরায়েল ও লেবানন ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হলেও সীমান্তে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি।
সূত্র: রয়টার্স


