রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, করদাতাদের হয়রানি কমানো এবং কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের কর প্রশাসন হবে সম্পূর্ণ ফেসলেস, স্বয়ংক্রিয় এবং ডিজিটালভিত্তিক; যেখানে করদাতাদের অধিকাংশ সেবা ঘরে বসেই পাওয়া সম্ভব হবে।
শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-তে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দেশের কর প্রশাসনকে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক করতে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগে প্রযুক্তিনির্ভর বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, করদাতাদের সশরীরে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে এনে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে একজন নাগরিক অনলাইনের মাধ্যমে রিটার্ন দাখিল, কর পরিশোধ, রিফান্ড আবেদনসহ সব ধরনের সেবা নিতে পারবেন। তাঁর ভাষায়, “নিয়ম মেনে কর প্রদানকারী মানুষ যেন কর অফিসে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করেন, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে কর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ, ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থাপনা চালুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বিশেষ করে কর নিরীক্ষা বা অডিট ব্যবস্থাকে আরও বৈজ্ঞানিক ও নিরপেক্ষ করতে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তনির্ভরতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে অডিট নির্বাচন নিয়ে করদাতাদের মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা কাজ করত। এ কারণে একটি কার্যকর ঝুঁকি-ভিত্তিক পদ্ধতি চালু না হওয়া পর্যন্ত গত দুই বছরে তিনি ভ্যাট ও আয়কর অডিট নির্বাচন প্রায় বন্ধ রেখেছিলেন। তাঁর মতে, যেসব করদাতা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর পরিশোধ করছেন, তাদের অযথা হয়রানি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
মো. আবদুর রহমান খান জানান, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ লাখ অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন জমা পড়েছে। এর ফলে একটি বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে করদাতাদের আচরণ বিশ্লেষণ, ঝুঁকি নির্ধারণ এবং কর পরিপালন পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, তথ্যভিত্তিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কর প্রশাসন আরও কার্যকর হবে এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমে আসবে।
করদাতাদের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত অনলাইন ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এই ড্যাশবোর্ডে একজন করদাতা নিজের কর সংক্রান্ত সব তথ্য এক জায়গায় দেখতে পারবেন। সেখানে বকেয়া কর, ফেরতযোগ্য অর্থ, রিফান্ডের অবস্থা, পরিশোধের ইতিহাস এবং অন্যান্য দায় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকবে। একই সঙ্গে অনলাইনে রিফান্ড আবেদন করার সুযোগও থাকবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দেশের অনেক করদাতার মধ্যে একটি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, তারা নিয়মিত কর দিলেও বিনিময়ে সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। সেই ধারণা বদলাতে চায় এনবিআর। করদাতাবান্ধব ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে কর প্রদানে উৎসাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে নগদ লেনদেন কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। চেয়ারম্যান জানান, অর্থনীতিতে নগদ টাকার ব্যবহার কমে গেলে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কর ফাঁকি কমানো সহজ হবে। এ লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না রেখেই সরাসরি নগদ অর্থে টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার (টিটি) বা পে-অর্ডার করার সুযোগ সীমিত করা যায়।
তাঁর মতে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল লেনদেন যত বাড়বে, রাজস্ব প্রশাসন তত বেশি দক্ষ ও কার্যকর হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্বচ্ছতা আসবে এবং অর্থপাচার ও কর ফাঁকির মতো অনিয়ম কমে আসবে।
তামাকজাত পণ্যের কর ব্যবস্থাপনা নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সিগারেট শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বাণিজ্য ও কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে আগামী বছর থেকে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ট্যাক্স স্ট্যাম্প চালু করা হবে। নতুন স্ট্যাম্পে কিউআর কোড ও এআর কোড সংযুক্ত থাকবে, যা স্ক্যান করে ভোক্তারা সহজেই যাচাই করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট পণ্যের কর পরিশোধ করা হয়েছে কি না।
তিনি আরও জানান, ভোক্তারা যদি কর ফাঁকি দেওয়া সিগারেট শনাক্ত করে তথ্য দেন, তাহলে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে একই ব্যবস্থা পানীয়, বোতলজাত পানি এবং অন্যান্য প্যাকেটজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ ব্যবস্থার ব্যবহার আরও বিস্তৃত করছে এবং ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পেপারলেস কাস্টমস ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, সময় ও খরচ কমবে এবং ব্যবসা পরিচালনা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার একদিকে রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ব্যবসা সহজীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তাই বাজেটে এমন একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআরের এই ডিজিটাল রূপান্তর পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা ও জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে করদাতাদের ভোগান্তি কমে কর প্রদানে আগ্রহও বাড়তে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর ও ফেসলেস সেবার মাধ্যমে কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করে তোলাই এখন এনবিআরের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


