যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়তে পারে ১৬ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক

অর্থনীতি স্লাইড

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইরান-কে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর সামরিক উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে, যার ফলে চলতি বছরে জ্বালানির দাম প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে—যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ; একই সঙ্গে ২০২৬ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার প্রধান কারণ জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধাতুর রেকর্ড উচ্চ মূল্য, ফলে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ তাদের ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে, যেখানে গত বছর একই সময়ে পণ্যমূল্য ১২ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তেল সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ প্রাথমিকভাবে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ এই পথে পরিবহন হয়।এতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ স্তর থেকে কিছুটা কমলেও এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বছরের শুরু থেকে ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২৬ সালে অপরিশোধেত তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৮৬ ডলার হতে পারে, যা ২০২৫ সালের ৬৯ ডলার থেকে অনেক বেশি। মে মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন কেটে যাবে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে- এমন অনুমানের ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, যুদ্ধের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগবে। বিশ্বের ৭০ শতাংশ পণ্য আমদানিকারক এবং ৬০ শতাংশ পণ্য রপ্তানিকারক দেশ তাদের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি দেখতে পারে। যদি সংঘাত আরও তীব্র হয় বা সরবরাহ বিঘ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। এতে সারের দাম ও বিকল্প জ্বালানির দামও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে, যা গত দশকে শুধুমাত্র ২০২২ সালেই এর চেয়ে বেশি ছিল।

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন্দরমিত গিল বলেন, এই যুদ্ধ প্রথমে জ্বালানির দাম, তারপর খাদ্যের দাম এবং শেষে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বিশ্ব অর্থনীতিকে আঘাত করছে। এতে সুদের হার বাড়বে এবং ঋণ আরও ব্যয়বহুল হবে। তিনি বলেন, ‘এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র মানুষ, যারা তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও জ্বালানিতে ব্যয় করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেগুলো ইতোমধ্যে ঋণের চাপে রয়েছে, তারাও বড় ধাক্কা খাবে। এটি আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়- যুদ্ধ মানে উন্নয়নের বিপরীত।’

পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে সারের দাম ৩১ শতাংশ বাড়তে পারে, যার মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে সার কেনার সামর্থ্য ২০২২ সালের পর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছাবে, যা কৃষকের আয় কমাবে এবং ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদন ঝুঁকিতে ফেলবে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্য সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ বাড়বে এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অনুযায়ী, এ বছর অতিরিক্ত ৪৫ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনসহ বেস মেটালের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে, যার পেছনে ডেটা সেন্টার, ইলেকট্রিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধি প্রধান ভূমিকা রাখছে; পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালে এসব ধাতুর গড় মূল্য প্রায় ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৫.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা যুদ্ধপূর্ব পূর্বাভাসের তুলনায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি এবং গত বছরের ৪.৭ শতাংশের চেয়েও উঁচু; একই সঙ্গে এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৬ শতাংশে নামতে পারে, যা জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *