কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী খুন: তদন্তে একাধিক সংস্থা

অর্থনীতি স্লাইড

 

কুমিল্লায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে জোরালো তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ ছাড়াও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সমন্বিতভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা একযোগে কাজ করায় ঘটনাটি দ্রুত উদঘাটনের আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

এর আগে শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল মোস্তফা জানান, ঘটনার শুরু থেকে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা তথ্য আদান-প্রদান করে কাজ করছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ থেকে বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে আলামত সংগ্রহ করা হয় এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়।

নিহত বুলেট বৈরাগী কুমিল্লা কাস্টমসের বিবির বাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি বেশ সৎ ও নিষ্ঠাবান ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। তার এই আকস্মিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো কাস্টমস বিভাগে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ফুটেজ পর্যালোচনা করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ভিসা কার্ড এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ ও জড়িতদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার সকালে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তার সহকর্মীরা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুল দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানান। অনেকেই এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার বলেন, “ঘটনার পর থেকেই আমরা প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি। তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হবে এবং অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে।”

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রশিক্ষণ শেষে শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন বুলেট বৈরাগী। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার শেষবারের মতো কথা হয়। এরপর তার মোবাইল ফোন থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যা সন্দেহের সৃষ্টি করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।

পরদিন সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েন। নিহতের বাবা সুশীল বৈরাগী বলেন, “ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। সে খুব পরিশ্রম করে এখানে পর্যন্ত এসেছে। এখন তার নিথর দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।” তার কণ্ঠে ছিল গভীর শোক ও ক্ষোভ।

পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। একই দাবি জানিয়েছেন সহকর্মী ও স্থানীয়রাও। তারা মনে করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

নিহতের মরদেহ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে এবং সেখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে পরিবার জানিয়েছে। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ঘটনাটির প্রতিটি দিক গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি জানানো সম্ভব হবে।

সামগ্রিকভাবে, একাধিক সংস্থার সমন্বিত তদন্তে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদঘাটিত হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *