ছাপানো টাকায় ঋণ নিচ্ছে সরকার, বাড়বে মূল্যস্ফীতি

ছাপানো টাকায় ঋণ নিচ্ছে সরকার, বাড়বে মূল্যস্ফীতি

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) এক সেমিনারে তারা রাজস্ব ও আর্থিক খাতে জরুরি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান জানান, গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা ‘হাইপাওয়ারড মানি’ বা ছাপানো অর্থ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে, পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এবারের বিষয় ছিল– বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।

মূল প্রবন্ধে ড. আশিকুর রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেলেও তা বেশ কিছু মৌলিক দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোর কারণে আর্থিক খাত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এর প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তার মতো তিনটি বাহ্যিক চাপের মুখে রয়েছে, যা জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহে দুর্বলতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মাধ্যমে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে রপ্তানি হ্রাস ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং সীমিত নীতিগত সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহবুবুর রহমান বলেন, এর আগে কখনও এত দীর্ঘ সময় দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল না। টাকা ছাপানো বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে বেশি খরচ করতে গেলেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। আইসিসিবি সভাপতি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাবেন কিনা, সেই চিন্তা করছেন। স্থানীয়রা বিনিয়োগ না করলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার ও ব্যবসায়ীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

জাইদি সাত্তার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না। সব জিনিসের দামের ওপরে জ্বালানির প্রভাব এ সময়ে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য নির্বাচিত সরকারকে বড় সংস্কারের দিকে যেতে হবে। ১৯৯১ সালের মতো ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন হবে।

প্যানেল আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বেশির ভাগ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ‘আত্মসৃষ্ট’। এগুলোর জন্য সাহসী, দেশীয় উদ্যোগে পরিচালিত সংস্কার জরুরি। অর্থিক খাতে যেসব আভাস পাওয়া যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক হওয়া দরকার। মেঘনা গ্রুপের পরিচালক তাহমিনা মোস্তফা রপ্তানি বৈচিত্র্যে জাহাজ শিল্পের সম্ভাবনা ও এর জন্য উন্নত অর্থায়ন ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *