একীভূত ৫ ব্যাংকের মালিকানায় ফিরছেন সাবেক মালিকরাই

একীভূত ৫ ব্যাংকের মালিকানায় ফিরছেন সাবেক মালিকরাই

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি করে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন সংশোধন করে নতুন একটি বিল পাস করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশোধিত এই আইনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী শেয়ারধারী বা মালিকদের জন্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়ার একটি নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে, যা ইতোমধ্যে আর্থিক খাতজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, একীভূত কোনো ব্যাংকের আগের মালিক বা শেয়ারধারীরা চাইলে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। এজন্য তাদেরকে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া মোট অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আবেদন করতে হবে। আবেদন গৃহীত হলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তারা পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বাকি অর্থ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সুদের শর্তও রাখা হয়েছে।

আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ারধারীরা বা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে এর জন্য একটি পৃথক অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে, যেখানে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠনের বিষয়ে একাধিক বাধ্যবাধকতা উল্লেখ থাকবে।

এই অঙ্গীকারনামায় আবেদনকারীকে উল্লেখ করতে হবে যে, তিনি বা তারা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা পরিশোধ করে ব্যাংক পরিচালনায় আগ্রহী। একই সঙ্গে নতুন মূলধন জোগান দেওয়া, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করা এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে হবে। এছাড়া সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো সরকারি বা আধা-সরকারি উৎস থেকে নেওয়া ঋণ, সুদ, গ্যারান্টি বা আর্থিক সুবিধা সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারও থাকতে হবে।

এছাড়াও পূর্ববর্তী আমানতকারী, দেশি-বিদেশি পাওনাদার এবং তৃতীয় পক্ষের সব বৈধ দাবি নিষ্পত্তির দায়িত্ব নিতে হবে আবেদনকারীকে। সরকারের কর ও অন্যান্য আর্থিক দায়ও পরিশোধ করতে হবে। রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক যদি শেয়ার হস্তান্তরে কোনো সময়সীমা বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তা মেনে চলতে হবে।

ব্যাংকের সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং কমপ্লায়েন্স কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়েও আবেদনকারীকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মনে করলে অতিরিক্ত শর্তও আরোপ করতে পারবে, যা মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে।

আইনের উপধারা অনুযায়ী, আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের তিন মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী শেয়ার বা সম্পদের দখল হস্তান্তরের আগে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থের সাড়ে ৭ শতাংশ পে-অর্ডার আকারে জমা দিতে হবে। বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের বিধান সংযোজনের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আপত্তি ছিল। তাদের মতে, এত কম অর্থ পরিশোধ করে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সংসদে বিরোধী দলও এই ধারা নিয়ে আপত্তি তুললেও শেষ পর্যন্ত তা উপেক্ষা করে বিলটি পাস করা হয়।

উল্লেখ্য, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫ এর আওতায় গত বছর পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক—একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক মানের অডিটসহ বিভিন্ন মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

নবগঠিত এই সম্মিলিত ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে প্রত্যেককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ স্কিম চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত দুর্বল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ শতাংশ, সেখানে এই পাঁচ ব্যাংকের অবস্থা অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

একই সময়ে এসব ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতির অর্ধেকেরও বেশি। এতে বোঝা যায়, এই পাঁচ ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের ওপর কতটা বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

ব্যাংকগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক। তবে এখানেও খেলাপি ঋণের হার ৬২ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৭৫ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই আইন বাস্তবায়নের ফলে আগের মালিকরা সহজেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ব্যাংকিং খাতে আবারও অনিয়ম ও ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কঠোর শর্ত আরোপের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যাংকগুলো দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতের এই নতুন আইন একদিকে যেমন পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবে এই বিধান কতটা কার্যকর হয় এবং দেশের ব্যাংকিং খাতকে কতটা স্থিতিশীল করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *