জ্বালানি মূল্য বাড়লেও কর না বাড়ানোর পরিকল্পনা

জ্বালানি মূল্য বাড়লেও কর না বাড়ানোর পরিকল্পনা

অর্থনীতি স্লাইড

 

বাজার স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য বাড়ানো হলেও আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১২০ টাকা হলে সরকার প্রায় ৩৮ টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় খুচরা মূল্য ১৪০ টাকায় উন্নীত হলেও শুল্ক ও কর একই রাখা হবে, যা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে প্রায় ৪৫ টাকা হওয়ার কথা। এতে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটারে কার্যত ৭ টাকা অতিরিক্ত চাপ এড়ানো সম্ভব হবে। যদিও এতে সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমবে, তবে মে ও জুন মাসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম রাখার কৌশল নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করা হলে সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোর ওপর এর প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পায়। তবে শুল্ক-কর অপরিবর্তিত রাখলে সেই চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে রাজস্ব আদায়ে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তার বিশ্লেষণসহ দ্রুত একটি প্রতিবেদন জমা দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈঠকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে আরও কিছু বিস্তৃত পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। শুক্রবার রাতে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এছাড়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকারকদের বাড়তি খরচ কমাতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এবং বিভিন্ন পণ্যের খরচ হিসাবের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় কমাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প কারখানা চালু করতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলের সমন্বয়ে একটি বড় ফান্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউন্সিল।

অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল এ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব, বাণিজ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে এত উচ্চহারে শুল্ক-কর নেই, তাই ধীরে ধীরে এসব শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা যাতে অযৌক্তিকভাবে দাম বৃদ্ধি করতে না পারে, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানির উপর ৩২ শতাংশের বেশি বিভিন্ন ধরনের শুল্ক, কর ও ভ্যাট রয়েছে। এখাত থেকে এনবিআর বছরে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দ্বিগুণ দরে জ্বালানি তেল আমদানি করছে সরকার, ফলে রাজস্ব আহরণের পরিমাণও দ্বিগুণ হচ্ছে। বিপিসি ও পেট্রোবাংলা তেল ও গ্যাস যে দামে আমদানি করে, বিক্রি করে তার চেয়েও কম দামে। ফলে তেল-গ্যাস আমদানির ওপর এনবিআরের আরোপ করা শুল্ক, কর ও ভ্যাট অযৌক্তিক উল্লেখ করে জ্বালানি বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে তা প্রত্যাহারের অনুরোধ করছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করে এনবিআর তা প্রত্যাহার করেনি- জানান অর্থবিভাগের একজন কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকে ভর্তুকি কমাতে সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। সেক্ষেত্রে সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হবে। যার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি অনেকটা বাড়বে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তেল-গ্যাস আমদানির ওপর বিদ্যমান শুল্ক, কর ও ভ্যাট অপরিবর্তিত রাখা জনগণের জন্য সহায়ক হতে পারে।প্রতি মাসের শেষে সরকার জ্বালানি তেলের দাম এডজাস্ট (সমন্বয়) করে। তাই শুল্ক-কর মওকুফ করা হলে তার প্রভাব কেমন হবে, তা বিশ্লেষণ করে মে মাসের শেষে দাম নির্ধারণের আগেই এনবিআরকে প্রতিবেদন দিতে বলেছে অর্থমন্ত্রণালয়- জানান অর্থবিভাগের অপর এক কর্মকর্তা।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নির্বাচনী ইশতিহার বাস্তবায়নে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বড় ব্যয়ের বাজেট প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়, যা কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯.২০ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তারা জানান, বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলা, ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আগামী অর্থবছরে প্রধানত বাজেট ব্যয় বাড়বে। এর সাথে বাড়তি সুদ পরিশোধ ও সরকারি কর্মচারি আংশিক বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনার ফলে বাজেট বড় করতে হচ্ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬.৯০ লাখ কোটি টাকা হতে পারে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এর মধ্যে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি ধরা হবে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষমাত্রা দেয়া হলেও—অর্থবছর শেষে ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা–সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা আরও ২০,০০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখাতে ভর্তুকিতে সরকারের অতিরিক্ত ৩৬,০০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গ্যাস-বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ মূল বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৪২,০০০ কোটি টাকা। এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষমাত্রা ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থেমে গেলে এবং জ্বালানি তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসলে, মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এছাড়া, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। নতুন অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করার বিষয়ে আলোচনা করছেন তারা। তবে চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৩.৯ শতাংশ হতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। শুক্রবার রাতেই অর্থমন্ত্রী, অর্থ সচিব, ইআরডি সচিব আইএমএফ এর সভায় যোগ দিতে ওয়াশিংটন গেছেন। এই যাত্রা উপলক্ষে সভাটি দ্রুত শেষ করা হয়েছে বলে জানান সভায় সংযুক্ত থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি জানিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আইএমএফের সভা থেকে ফিরে আসার পরে বাজেট প্রণয়ন নিয়ে পুনরায় বৈঠক করবেন।

আগামী অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছি। নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটের কাছে জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা সে সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন। অন্যদিকে, জনগণও উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমাদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখবেন—এটাও আমরা আশা করি। আমাদের এবারের লক্ষ্য কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *