কালো টাকা বিনিয়োগে ছাড় নয়: এনবিআর

অর্থনীতি স্লাইড

 

দেশের আবাসন খাতে কোনো ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই কম কর দিয়ে অঘোষিত বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আবাসন খাতের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) এ ধরনের সুযোগ পুনর্বহালের দাবি জানালেও এনবিআর জানিয়েছে—কালো টাকা বৈধ করার পুরোনো সংস্কৃতিতে আর ফিরতে চায় না সরকার।

বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় রিহ্যাবের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। আলোচনায় সংগঠনটির সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান এবং সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া আবাসন খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এ সময় তারা বলেন, বর্তমানে আবাসন খাত নানা সংকটের মুখোমুখি, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ নির্মাণ ব্যয়, ক্রেতা সংকট, নিবন্ধন ব্যয়ের চাপ এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়া।

রিহ্যাবের লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ যাতে প্রশ্ন তুলতে না পারে—এমন বিধান আয়কর অধ্যাদেশে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। সংগঠনটির মতে, এ ধরনের সুযোগ থাকলে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং স্থবির হয়ে পড়া বাজারে নতুন গতি আসবে।

রিহ্যাবের সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে অর্থ পাঠালেও বিভিন্ন কারণে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন না। ফলে পরবর্তীতে সেই অর্থ অঘোষিত বা কালো টাকা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ না থাকলে তা দেশের অর্থনীতিতে ব্যবহার না হয়ে বিদেশেই থেকে যায় বা অন্য খাতে চলে যায়। তাই আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান পুনর্বহাল করা হলে দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে স্পষ্ট আপত্তি জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে কালো টাকা বিনিয়োগের যে সংস্কৃতি চালু ছিল, সরকার এখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তিনি বলেন, “আমরা প্রায় ৫৫ বছর ধরে এই সংস্কৃতিতে ছিলাম। কিন্তু এখন আর সেই পথ ধরে এগোতে চাই না।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠালে সরকার নগদ প্রণোদনাও দিচ্ছে। ফলে নিয়মিত উপায়ে টাকা পাঠিয়ে আইনগতভাবে বৈধ করার সুযোগ থাকতেই অঘোষিত অর্থ বিনিয়োগের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ যদি অঘোষিত অর্থ বৈধ করতে চান, তবে তাকে প্রচলিত কর আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

প্রসঙ্গত, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকার একটি বিশেষ বিধান চালু করেছিল, যার মাধ্যমে আবাসন খাতে অঘোষিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই বিধানের আওতায় কেউ যদি কালো টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতেন, তবে সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি সংস্থা প্রশ্ন তুলতে পারত না। একই সঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের যেখানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হতো, সেখানে অঘোষিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিলেই তা বৈধ হয়ে যেত।

তবে এই সুবিধা চালুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়, এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন এবং দুর্নীতির অর্থ বৈধ করার পথ আরও সহজ হয়ে যায়। এসব সমালোচনার মুখে সরকার ধীরে ধীরে ওই নীতি থেকে সরে আসে।

বর্তমানে আবাসন খাতে অঘোষিত অর্থ বিনিয়োগে আগের মতো কোনো বিশেষ কর সুবিধা নেই। বরং যে কেউ বিনিয়োগ করলে তাকে প্রচলিত করহার অনুযায়ী কর দিতে হয় এবং প্রয়োজন হলে জরিমানাও গুনতে হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলতে পারে।

এদিকে প্রাক-বাজেট আলোচনায় রিহ্যাব আবাসন খাতকে গতিশীল করতে আরও কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ে নিবন্ধন ব্যয় কমানো, আবাসন খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ, এবং ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি বা পুনর্বিক্রয় বাজার গড়ে তুলতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া।

রিহ্যাবের নেতারা বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দুই শতাধিক শিল্প ও সেবা খাত জড়িত। ফলে আবাসন খাতে মন্দা দেখা দিলে তার প্রভাব অন্যান্য খাতেও পড়ে। তাই সরকারের নীতি সহায়তা ও কর কাঠামো সহজ করলে এই খাত আবারও গতিশীল হতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায্য করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যেই কালো টাকা বিনিয়োগের মতো বিশেষ সুবিধা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *