সারা বছরই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে: এনবিআর চেয়ারম্যান

সারা বছরই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে: এনবিআর চেয়ারম্যান

অর্থনীতি স্লাইড

 

আগামী অর্থবছর থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছরই অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ তথ্য জানান এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করদাতাদের জন্য রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সময়োপযোগী করতে এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে করদাতাদের আর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। তারা চাইলে বছরের যেকোনো সময় অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।

বর্তমানে দেশে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। সাধারণত জুন মাস থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম চালু রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে করদাতাদের অতিরিক্ত জটিলতা, জরিমানা কিংবা সময় বৃদ্ধির আবেদনসহ নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে করদাতাদের মুক্তি দিতে এবং কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করতে সরকার সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালুর পরিকল্পনা করছে। নতুন ব্যবস্থার ফলে করদাতারা নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নিয়ে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। এতে একদিকে করদাতাদের চাপ কমবে, অন্যদিকে কর প্রশাসনের কাজও আরও সহজ ও কার্যকর হবে বলে মনে করছে এনবিআর।

তবে সারা বছর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত কোনো চাপ পড়বে না এবং তারা বেশ কিছু সুবিধা পাবেন।

তিনি জানান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে না। এছাড়া সময়মতো রিটার্ন দাখিল করলে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত বা কর রিবেটের সুবিধাও বহাল থাকবে। এতে করদাতারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এছাড়া দ্রুত রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য প্রশাসনিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। অর্থাৎ যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করবেন, তাদের বিভিন্ন করসংক্রান্ত সেবা দ্রুত প্রদান করা হবে। এতে করদাতাদের ভোগান্তি কমবে এবং কর ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও বাড়বে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ এবং করদাতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে কর অব্যাহতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এর ফলে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণেই আগামী ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর অব্যাহতির পরিমাণ কিছুটা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বর্তমানে দেশের অনেক সম্ভাব্য করদাতা এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। তাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আরও জানান, কর ফাঁকি রোধে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে ট্যাক্স লিকেজ বা কর ফাঁকির পথগুলো বন্ধ করতে কর প্রশাসন আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। কর ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, কর প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। যারা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন এবং রাজস্ব আদায়ে অবদান রাখছেন, তাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং সাংবাদিকরাও কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও আধুনিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা মনে করেন, সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু হলে করদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।

সব মিলিয়ে কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল, সহজ ও করদাতা-বান্ধব করার লক্ষ্য নিয়েই সারা বছর অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের কর ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং করদাতাদের অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *