নতুন পে-স্কেল: আগামী অর্থবছরেও বাস্তবায়ন অনিশ্চিত

নতুন পে-স্কেল: আগামী অর্থবছরেও বাস্তবায়ন অনিশ্চিত

অর্থনীতি স্লাইড

 

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রধানমন্ত্রীর মতামতের ওপর। এ বিষয়ে কমিশন প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অর্থ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার জাতীয় বেতন কমিশনের সদস্যরা একটি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—সরকার যদি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেন, তবেই কমিশনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। অন্যথায় কমিশনের কাজ কার্যত স্থগিত থাকবে। সূত্র জানিয়েছে, কমিশনের পক্ষ থেকে শিগগিরই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর মতামত পাওয়ার পর কমিশনের সদস্যরা পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন। ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসলে কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় সক্রিয় করা হবে এবং বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু করা হবে।

আগে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা মাথায় রেখে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন ও ভাতা খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি এবং ভাতা সমন্বয়ের জন্য এই অর্থ আলাদা রাখা হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বজায় রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রাখতে নতুনভাবে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন পড়েছে। ফলে বেতন ও ভাতা খাতে সংরক্ষিত প্রায় পুরো অর্থই ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, যার কারণে চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার আর্থিক সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি থেকে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে কৃষি খাতে ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বজায় রাখাও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য যে প্রস্তুতি আগে নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নের মতো আর্থিক অবস্থা নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারের বাজেট পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যে পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনাও খুব বেশি নেই। বাজেটের বড় অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন জরুরি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয়ের বৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে তা সরাসরি বাজেট ঘাটতি এবং ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়ায়। তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বজায় রাখতে হচ্ছে। ফলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করা ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প থাকছে না।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাজেট ব্যবস্থাপনায় কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কমিশন বাস্তবায়ন একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং এটি কার্যকর করতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভবিষ্যতে আবারও বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতে পারে। এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বজায় রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *