জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও সুরক্ষিত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে নিজস্ব ‘সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার (এসওসি)’ চালু করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ কাস্টমসের সাইবার স্পেসে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সাইবার আক্রমণ, ঝুঁকি, সন্দেহজনক কার্যক্রম এবং নানাবিধ ডিজিটাল হুমকি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ, শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
রোববার (৪ ডিসেম্বর) এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সংস্থার নিজস্ব এই এসওসি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে এনবিআর। সংস্থাটির দাবি, এই এসওসি স্থাপনের ফলে কাস্টমস ও রাজস্ব ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার আরও নিরাপদ হবে এবং সাইবার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই এসওসি
বর্তমান সময়ে রাজস্ব আদায়, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থাপনা, শুল্কায়ন, কর হিসাব, ডেটা সংরক্ষণ—সবকিছুই প্রায় পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বাংলাদেশ কাস্টমসের ক্ষেত্রে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA World) সিস্টেম ব্যবহার করে শুল্কায়নের হিসাব, পণ্য ছাড়করণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল তথ্য পরিচালনা করা হয়।
এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে সামান্য সাইবার অনুপ্রবেশ বা তথ্য ফাঁসের ঘটনা শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সে কারণেই এনবিআর দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করছিল। এসওসি চালুর মাধ্যমে সেই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কীভাবে কাজ করবে এনবিআরের এসওসি
এনবিআরের এসওসি একটি বিশেষায়িত ও প্রশিক্ষিত টিমের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই টিম উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা টুলস এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সার্বক্ষণিকভাবে সিস্টেম মনিটরিং করবে।
এসওসি থেকে—
- সন্দেহজনক নেটওয়ার্ক ট্রাফিক শনাক্ত করা,
- অননুমোদিত প্রবেশ বা হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চিহ্নিত করা,
- ম্যালওয়্যার, র্যানসমওয়্যার বা ফিশিং আক্রমণ প্রতিরোধ,
- অভ্যন্তরীণ তথ্য অপব্যবহার বা ডেটা লিকের ঝুঁকি বিশ্লেষণ,
- জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও রিকভারি ব্যবস্থা গ্রহণ— এসব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হবে।
এছাড়া সম্ভাব্য সাইবার হুমকি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা (Early Warning) প্রদান এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ আক্রমণ প্রতিরোধেও এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য
এনবিআর জানিয়েছে, ‘ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি (এনসিএসএ)’ প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা ও কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই এসওসি স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং সরকারের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের অবকাঠামো, ডেটাবেজ এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্যসম্পদের নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে ঝুঁকি হ্রাস, ডেটার অখণ্ডতা (Data Integrity) রক্ষা এবং সিস্টেমের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
রাজস্ব ব্যবস্থায় আস্থা বৃদ্ধির প্রত্যাশা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এনবিআরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নিজস্ব এসওসি চালু হওয়া দেশের ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা। এতে ব্যবসায়ী, আমদানিকারক-রপ্তানিকারক এবং করদাতাদের মধ্যেও আস্থা বাড়বে যে তাঁদের তথ্য নিরাপদ হাতে রয়েছে।
একই সঙ্গে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই এসওসির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করে অন্যান্য রাজস্ব সংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম ও সিস্টেমের নিরাপত্তা জোরদার করা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, এনবিআরের নিজস্ব সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার চালু হওয়া দেশের রাজস্ব প্রশাসনে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল—যা ডিজিটাল ঝুঁকির এই সময়ে অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

