২০২৩-২৪ করবর্ষের আরও ৭২ হাজার ৩৪১টি আয়কর রিটার্ন অডিট বা নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অডিট কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবার সম্পূর্ণ অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে এসব রিটার্ন নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ তথ্য জানান এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করে এনবিআর।
সংস্থাটি জানিয়েছে, কর প্রশাসনকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও হয়রানিমুক্ত করতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এর ফলে করদাতাদের রিটার্ন নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত প্রভাব বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে করদাতা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হচ্ছিল। এনবিআর বলছে, নতুন এই ব্যবস্থা সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই মাসে ২০২৩-২৪ করবর্ষের জন্য প্রথম ধাপে ১৫ হাজার ৪৯৪টি আয়কর রিটার্ন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও ৭২ হাজার ৩৪১টি রিটার্ন যুক্ত হওয়ায় মোট অডিটের আওতায় আসা রিটার্নের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। প্রতিটি কর সার্কেলের জন্য সর্বোচ্চ ২০০ এবং সর্বনিম্ন ২০ জন করদাতাকে অডিটের আওতায় আনা হয়েছে। করদাতাদের আয়, ব্যয়ের ধরন, কর পরিশোধের ইতিহাস, ঘোষিত সম্পদের তথ্যসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ নির্বাচন করা হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক কর প্রশাসনে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অডিট ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে যেমন কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে, অন্যদিকে সৎ করদাতাদের অযথা হয়রানিও কমবে।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় নির্বাচিত টিআইএন নম্বরের তালিকা ইতোমধ্যে এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট করদাতারা অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের তথ্য যাচাই করতে পারবেন বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে একই অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশের রাজস্বব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক কাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠন তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), আইসিএবি, আইসিএমএবি, বিল্ডসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।
তামাকবিরোধী সংগঠন আত্মা সিগারেটের মূল্যস্তর পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়ে জানায়, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে উচ্চ স্তরের সিগারেটের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা করার প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। তাদের মতে, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করলে ধূমপানের প্রবণতা কমবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, এনবিআরকে পুনর্গঠন করে করনীতি বিভাগ ও কর বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বেসরকারি খাতকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে এ বিষয়ে একটি সমন্বিত ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) তাদের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেছে, বর্তমানে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ২৮ শতাংশ আসে বাণিজ্যিক শুল্ক থেকে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ নির্ভরতা কমিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, অভ্যন্তরীণ কর আহরণ বাড়াতে পারলে আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে বের করে পুরোপুরি সিস্টেমনির্ভর করার পরামর্শ দেয় পিআরআই। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করা গেলে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি উভয়ই কমবে।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও টিআইএনের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনবিআরের তথ্য সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। সংগঠনটির প্রতিনিধি ইয়াসিন মিয়া বলেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে একজন ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে কতগুলো হিসাব, সঞ্চয়পত্র বা এফডিআর রয়েছে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে গোপন আয় ও সম্পদ চিহ্নিত করা সহজ হবে।
ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রতিনিধি মো. মহিমান বলেন, শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিতে নগদ লভ্যাংশের ওপর ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মত দেন।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে, কিছু পণ্য ও সেবা আইন অনুযায়ী করমুক্ত হলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সেগুলোর ওপর ভ্যাট আদায় করছে। সংগঠনটি এই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানায়। একই সঙ্গে শিপিং এজেন্সি কমিশনের ওপর উৎসে কর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয় তারা।
অন্যদিকে ইনডেনটিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন রপ্তানিমুখী ইনডেনটিং সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানায়। সংগঠনটি বলছে, এ খাতে উচ্চ ভ্যাট ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
এসএমই খাতের উন্নয়নে একটি পৃথক করব্যবস্থা প্রবর্তনেরও প্রস্তাব এসেছে আলোচনায়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বার্ষিক টার্নওভার ও প্রতিষ্ঠানের আকার বিবেচনায় সহজ ও নির্দিষ্ট করহার নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি নতুন এসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যবসার প্রথম ১০ বছর ন্যূনতম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, রাজস্ব খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে পারলে কর আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশও উন্নত হবে।


