‘বাজেটে সিগারেটের ওপর শুল্ক-কর বাড়ানোর সম্ভাবনা নেই’

অর্থনীতি স্লাইড

 

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন করে শুল্ক-কর বাড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, বর্তমানে সিগারেটের ওপর যে পরিমাণ শুল্ক ও কর আরোপ করা রয়েছে, তার সীমা প্রায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাই নতুন করে কর বৃদ্ধির খুব বেশি সুযোগ নেই। তবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বাজারদর বিবেচনায় সিগারেটের মূল্য কাঠামো পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত রাজস্ব ভবনে তামাক খাতসংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে তামাক শিল্পের বিভিন্ন কোম্পানি, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা আগামী বাজেটে করনীতি, অবৈধ বাণিজ্য, মূল্য নির্ধারণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন।

সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, বর্তমানে দেশে সিগারেটের ওপর প্রায় ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর আরোপ করা হয়। এর চেয়ে বেশি কর আরোপ বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, ‘সিগারেটের ওপর ৮৩ শতাংশের বেশি শুল্ক-কর যাওয়ার উপায় নেই। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের বাজারদর ও কর কাঠামো বিবেচনায় হয়তো মূল্য পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি দেখা যেতে পারে। কারণ, আশপাশের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এখনও সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম।’

তিনি আরও বলেন, সরকার একদিকে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণেও নজর দিচ্ছে। বাজারে কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে সিগারেট সরবরাহের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রাক্-বাজেট আলোচনায় ন্যাশনাল সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা অবৈধ সিগারেট আমদানি ও বাজারজাতকরণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। সংগঠনটির পক্ষে আবুল খায়ের গ্রুপের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড লিগ্যাল বিভাগের প্রধান শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, দেশে অবৈধ সিগারেটের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এতে বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি বলেন, অবৈধ সিগারেট আমদানি বন্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অবৈধ বাণিজ্য ঠেকাতে সরকার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তিনি জানান, সিগারেটের প্যাকেটে বিশেষ কোড বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘অবৈধ কারবার বন্ধে আমরা সিগারেটের গায়ে এয়ার কোড বসিয়ে দেব।’ এর মাধ্যমে উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত পণ্যের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

বৈঠকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর প্রতিনিধিরাও অবৈধ সিগারেটকে এ শিল্পের বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, কর কাঠামো জটিল হলে এবং বাজারে অবৈধ পণ্যের প্রবেশ বাড়লে বৈধ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে জাপান টোব্যাকোর প্রতিনিধিরা বলেন, বিশ্বের যেসব দেশে সিগারেটের ওপর সবচেয়ে বেশি কর আরোপ করা হয়, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। তাই আগামী বাজেটে নতুন করে কর না বাড়ানোর অনুরোধ জানান তারা। তাদের দাবি, অতিরিক্ত করের ফলে অবৈধ বাজার সম্প্রসারণের ঝুঁকি বাড়ে এবং বৈধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে।

প্রাক্-বাজেট বৈঠকে শুধু তামাক খাত নয়, টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল ফোন শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরাও নিজেদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) পক্ষ থেকে সিমকার্ড পুনঃইস্যুর ক্ষেত্রে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটির মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, কোনো গ্রাহকের সিমকার্ড হারিয়ে গেলে নতুন সিম নিতে গিয়ে আবার ৩০০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। এতে একই সেবার ওপর একাধিকবার কর আরোপের পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা গ্রাহকদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি এই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এ সময় মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিকভাবে আমদানি হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, আনঅফিশিয়াল মোবাইল ফোনের কারণে স্থানীয় শিল্প ও বৈধ আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে দ্রুত ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।

সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আসন্ন বাজেটে শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ, কর কাঠামো সহজীকরণ এবং অবৈধ বাণিজ্য দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এনবিআর চেয়ারম্যানও বিভিন্ন খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসা সুরক্ষা ও কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *