বাজেট ২০২৬-২৭: রাজস্ব বাড়াতে ভ্যাটে আসছে রিটেইল ও এসএমই খাত

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

দেশের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে খুচরা ব্যবসা (রিটেইল) ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই খাতেই রয়েছে রাজস্ব আদায়ের বিশাল সম্ভাবনা, কিন্তু জটিল প্রক্রিয়া ও সীমিত তদারকির কারণে এখনো অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিটেইল বা খুচরা ব্যবসা খাতকে সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাড়ার ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় শপিংমল, সুপারশপ, ব্র্যান্ডের শোরুম, ফার্মেসি, ফার্নিচার দোকান, কনস্ট্রাকশন ও হার্ডওয়্যার ব্যবসা, এমনকি ই-কমার্স বা অনলাইন ব্যবসাও এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। দেশের মোট খুচরা ভোগের প্রায় ৯৮ শতাংশই এই খাতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে এত বড় খাত হওয়া সত্ত্বেও ভ্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখেরও বেশি। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। ফলে সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশই অপ্রাপ্ত থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, এসএমই খাতকে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। এই খাতে ক্ষুদ্র, মাঝারি, কুটির শিল্প থেকে শুরু করে সেবা ও উৎপাদন খাতের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি, যার বড় অংশই এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। ধারণা করা হয়, এই খাতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-তে এই খাতের অবদান প্রায় ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ।

তবে এই বিশাল খাত থেকেও প্রত্যাশিত হারে ভ্যাট আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্যাট নিবন্ধন না থাকা এবং নিয়মিত রিটার্ন দাখিল না করার কারণে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এখনো কর জালের বাইরে রয়ে গেছে।

এ অবস্থায় ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। বিশেষ করে রিটেইল ও এসএমই খাতের জন্য ভ্যাট রিটার্ন প্রক্রিয়া একেবারে সহজ করে এক থেকে দুই পাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজেই রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—বর্তমান ভ্যাট নিবন্ধন ও রিটার্ন পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল, যা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য পরিচালনা করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে তারা হিসাবরক্ষণ বা ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত নন। ফলে তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর প্রক্রিয়া সহজীকরণে জোর দিচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে এই দুই খাত থেকে অন্তত ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকটি মাসে গড়ে ১ হাজার টাকা করে ভ্যাট দেয়, তাহলে মাসিক রাজস্ব আদায় দাঁড়াবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা, যা বছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। আর যদি গড়ে ২ হাজার টাকা করে ভ্যাট আদায় করা যায়, তাহলে মাসে ৪০০ কোটি এবং বছরে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া সম্ভব।

বর্তমানে এনবিআরের হিসাবে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৯২ হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে রিটেইল বা ক্ষুদ্র খাতের প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬১৪টি। এছাড়া সেবা খাতে প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার ১৫৩টি, আমদানি-রপ্তানি খাতে ৯৭ হাজার ৩৯১টি, উৎপাদন খাতে ৪৭ হাজার ৯৯৩টি এবং অন্যান্য খাতে ১৪ হাজার ২৪৭টি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় রয়েছে।

তবে এত বিপুলসংখ্যক খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই বলে জানিয়েছেন ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মনে করেন, ভ্যাট নিবন্ধন নিলে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে এবং তা করতে না পারলে জরিমানার মুখে পড়তে হবে—এই ভয়ে তারা নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হন না।

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধনকে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে। অর্থাৎ, ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু সরকারি বা আর্থিক সেবা পাওয়া যাবে না। এতে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে নিবন্ধনের আওতায় আসবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম উন্নত করা এবং করদাতাদের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, যদি নিবন্ধন ও রিটার্ন প্রক্রিয়া সত্যিই সহজ করা যায়, তাহলে অন্তত ১০ লাখের বেশি নতুন প্রতিষ্ঠান দ্রুত ভ্যাট নেটের আওতায় চলে আসবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে শুধু কঠোরতা নয়, বরং কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সুবিধা ও সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রিটেইল ও এসএমই খাতকে ভ্যাট নেটের আওতায় আনার এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে করের ভিত্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *