ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের মধ্যে বড় ব্যবধান

অর্থনীতি স্লাইড

 

ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে বছর দেড়েক আগে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ঋণ ও আমানতে সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) নির্ধারণে ৪ শতাংশের যে সীমা ছিল, তা উঠিয়ে দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলো এখন নিজেদের মতো সুদহার নির্ধারণ করতে পারে। তবে এ ব্যবস্থায় ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বেড়ে কোনো কোনো ব্যাংকে ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ প্রবণতা ঋণ ব্যয়বহুল করে ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরে সম্মিলিত চেষ্টায় ‘স্প্রেড’ সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর।

দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ৬ শতাংশের আশপাশে থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। আর ঋণ বিতরণ করেছে গড়ে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ সুদে। এতে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। যদিও সাতটি ব্যাংকের স্প্রেড ৮ থেকে ১০ শতাংশের ওপরে। ৬ থেকে ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে ১৭টি ব্যাংকের স্প্রেড। ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্প্রেডে সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেওয়ার মাসে যা ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকে গত ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় ‘স্প্রেড’ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, ২০২৪ সালের এক নির্দেশনার মাধ্যমে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো বর্তমানে স্প্রেড বেশি হারে বাড়িয়ে ৫ থেকে ৮ শতাংশের ওপরে নিয়েছে, যা ঋণকে ব্যয়বহুল করছে এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশের ঋণ ও আমানতে সুদহারের ব্যবধান ৩ শতাংশের নিচে রয়েছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। জানা গেছে, নৈতিক চাপ তৈরি করে স্প্রেড কমাতে বলা হবে। তবে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে না।

কয়েকজন ব্যাংকারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, কিছু ব্যাংকের খারাপ অবস্থার কারণে আমানতকারীদের একটি অংশ টাকা তুলে নিয়ে তুলনামূলক ভালো ব্যাংকে রাখছে। সুদহারের চেয়ে টাকা নিরাপদ থাকবে কিনা– এমন চিন্তা অনেকের মধ্যে রয়েছে। এমন অবস্থায় ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলো অনেক কম সুদ অফার করেও প্রচুর আমানত পাচ্ছে। ঋণের সুদহার সেই হারে তারা কমাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম। ট্রেজারি বিল, বন্ডে টাকা রেখেও ব্যাংকগুলো ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। এসবের প্রভাবে স্প্রেড অনেক বেড়েছে। উচ্চ ‘স্প্রেড’ ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো কেমন মুনাফা করছে– তা বোঝার জন্য ‘স্প্রেড’ একমাত্র সূচক ধরলে হবে না। কেননা স্প্রেড হিসাবের ক্ষেত্রে আমানত ও ঋণের ‘গ্রস’ সুদহারকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য নিট মুনাফা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ওই ব্যাংকের খেলাপি ঋণসহ অন্যান্য বিষয় দেখতে হবে।

২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদহারে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সীমা দিয়ে রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আইএমএফের ঋণের শর্ত মেনে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে সুদহার নির্ধারণে প্রথমে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয়। এ ব্যবস্থায় ১৮০ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের সঙ্গে আরও ৩ শতাংশ যোগ করে সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারিত হতো। ওই বছরের নভেম্বরে অপর এক নির্দেশনায় স্প্রেডে ৪ শতাংশের সীমা তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৮ মে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা বেচাকেনায় ‘ক্রলিং পেগ’ চালু করে এক ধাপে প্রতি ডলারে সাত টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *