দেশ আবারও বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা, আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পর সারা দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর এমন সতর্কবার্তা পাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব ইউনিটে কড়া নির্দেশনা দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পুলিশের এক গোপনীয় চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, জঙ্গি সংগঠনের সমর্থকরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার চেষ্টা করতে পারে। ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) স্বাক্ষরিত ওই চিঠি মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে অভিযান শুরু হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে মোহাম্মদের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সাবেক সেনা সদস্যের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ বা অস্ত্র হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সমন্বিত যোগাযোগ একটি বড় ধরনের হামলার পূর্বাভাস হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে দেড় হাজারের বেশি উগ্রবাদী বিভিন্নভাবে সক্রিয় রয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে কাজ করছে। তাদের একটি অংশ কারাগার থেকে পলাতক এবং একটি অংশ ছদ্মনামে সংগঠিত হয়ে পুনরায় নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, সম্ভাব্য হামলার তথ্য ইতোমধ্যেই উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করেছে। এরপরই দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘জঙ্গি নেই’—এমন ধারণা তৈরি করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তার মতে, এই ধরনের ধারণার কারণে জঙ্গি দমন কার্যক্রমের কিছু অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং উগ্রবাদীরা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, দেশের ভেতরে বর্তমানে ২০টির বেশি জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় বা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হিযবুত তাহরীরসহ আরও কয়েকটি সংগঠন। নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও এসব সংগঠনের সদস্যরা নতুন নামে বা গোপন নেটওয়ার্কে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলা বাংলাদেশ ২০০৫ দেশের জঙ্গিবাদের বড় একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে একযোগে সারা দেশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল। সেই ঘটনার পর জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো তা পুরোপুরি নির্মূল হয়নি; বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা আরও কৌশলী হয়ে উঠছে।
বর্তমান নিরাপত্তা শঙ্কার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে কারাগার থেকে পলাতক জঙ্গিদের বিষয়টি। গত বছরের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন কারাগারে বিশৃঙ্খলার সুযোগে বহু বন্দি পালিয়ে যায়। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি সম্পৃক্ত আসামি রয়েছে, যারা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) এবং তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর কিছু এজেন্ট বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এই ধরনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
টিটিপির কার্যক্রম নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি এক বাংলাদেশি যুবক পাকিস্তানে গিয়ে এই সংগঠনে যোগ দিয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে জনবল সংগ্রহের একটি নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং কিছু ব্যক্তি অনলাইনের মাধ্যমে তরুণদের উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ করছে।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য হামলার তথ্য পাওয়ার পর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে এবং জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তিনি জানান, জঙ্গিদের সংখ্যা, গ্রেপ্তার ও পলাতক সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও তিনি আশ্বস্ত করেন যে, সম্ভাব্য সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি বিস্ফোরণের ঘটনাও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বিস্ফোরণ এবং শরীয়তপুরের জাজিরায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা প্রমাণ করে যে, জঙ্গিদের হাতে এখনও বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। এসব ঘটনার পর যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ককটেল, বোমা তৈরির সরঞ্জাম এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে।
মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, তারা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক যেকোনো কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গি হুমকি মোকাবিলায় শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জরুরি। তারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দেশে জঙ্গি হামলার সম্ভাবনা নতুন করে সামনে আসায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যদিও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে আশাবাদী, তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।


