চট্টগ্রামে সরকারি প্রশিক্ষণ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন বুলেট বৈরাগী (৩৫) নামে এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। গত ২৪ এপ্রিল গভীর রাতে কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় পরিবারে নেমে এসেছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
নিখোঁজ বুলেট বৈরাগী কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের একজন কর্মরত কর্মকর্তা। তিনি সম্প্রতি চট্টগ্রামে আয়োজিত ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী তিনি ঢাকায় ফেরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তবে পথে কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তিনি নিখোঁজ হলেন—তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুলেট বৈরাগী গত ১১ এপ্রিল সরকারি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চট্টগ্রামে যান। প্রশিক্ষণ শেষে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে ওঠেন। যাত্রাপথে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এতে পরিবারের কেউ কোনো অস্বাভাবিকতা টের পাননি।
তবে ২৫ এপ্রিল রাত আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে তার সঙ্গে পরিবারের সর্বশেষ কথা হয়। সে সময় তিনি জানান, তিনি কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। পরিবারের সদস্যরা পরবর্তীতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তিনি বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করা হয়। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, এমনকি সম্ভাব্য হাসপাতালগুলোতেও খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু কোথাও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এতে করে পরিবারটি চরম উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে।
নিখোঁজের বাবা সুশীল বৈরাগী বলেন, “আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে রাত আড়াইটার দিকে। সে বলেছিল টমছমব্রিজে আছে। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ। আমরা সব জায়গায় খুঁজেছি, আত্মীয়স্বজনদের বাসায় খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু কোনো হদিস পাইনি। বাধ্য হয়ে আমরা থানায় অভিযোগ করেছি।”
এ ঘটনায় শনিবার (২৫ এপ্রিল) কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নিখোঁজের বাবা। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ বিষয়টি তদন্তে নেয় এবং সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, “নিখোঁজের বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিগত সহায়তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা অনুসন্ধান চালাচ্ছি। আশা করছি দ্রুতই কিছু তথ্য পাওয়া যাবে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুলেট বৈরাগী যে বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন, সেটির তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বাসের চালক, হেলপার ও অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া টমছমব্রিজ এলাকার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজও চলছে, যাতে তার সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
এদিকে, একজন সরকারি কর্মকর্তা এভাবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বিষয়টি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই দ্রুত তাকে খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বুলেট বৈরাগীর কোনো শত্রুতা বা ব্যক্তিগত বিরোধের তথ্য তাদের জানা নেই। তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন এবং নিয়মিত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি তাদের কাছে আরও রহস্যজনক মনে হচ্ছে।
বর্তমানে পরিবারটির একমাত্র প্রত্যাশা—তিনি যেন সুস্থ ও নিরাপদ অবস্থায় দ্রুত ফিরে আসেন। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের কাছে জোরালোভাবে আহ্বান জানিয়েছেন, দ্রুত তদন্ত করে তার সন্ধান বের করার জন্য।
নিখোঁজের এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান তদন্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে পরবর্তী অগ্রগতি। যতক্ষণ পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রহস্য ও উদ্বেগ দুটোই বাড়তেই থাকবে।


