বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। নতুন বছরের প্রথম দিনে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়াকে অনেকেই বাঙালিয়ানার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখে থাকেন। তবে ইলিশকে পাশে সরিয়ে রাখলে প্রশ্ন ওঠে; ঠিক কত বছর আগে বাঙালি পান্তা খাওয়া শুরু করেছিল? পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাতের প্রচলন মূলত গ্রাম-বাংলার কৃষকদের দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস থেকেই এসেছে, যা নব্বই দশকের শেষের দিকে ঢাকাসহ সারা দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা ইলিশের সম্পর্ক খুব বেশি পুরোনো নয়। ৮০-র দশকে ঢাকার রমনা পার্ককে কেন্দ্র করে শহুরে বৈশাখ উৎসবের সূচনা হয়। তখন কয়েকজন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আড্ডার ছলে সিদ্ধান্ত নেন, বৈশাখের সকালে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা পরিবেশন করা হবে। এরপর রমনার বটমূলের সামনে প্রথমবারের মতো পান্তা ইলিশ উপভোগ করা হয়।
তবে বাঙালি ঠিক কত বছর আগে থেকে পান্তা ভাত খায়, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব জানা যায়নি। কিন্তু মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে কালকেতুর ভোজন পর্বে পান্তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
‘মোচড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধিলেন ঘাড়ে; এক শ্বাসে সাত হাড়ি আমানি উজাড়েৎ; চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ; ছয় হান্ডি মুসুরি সুপ মিশ্যা তথি লাউ।’ – চণ্ডীমঙ্গলের এই বর্ণনা অনুযায়ী, বাংলা নববর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন আঞ্চলিক আয়োজন ছিল ‘আমানি’। চৈত্র সংক্রান্তির শেষ প্রহরে কৃষাণিরা হাঁড়িতে অপরিপক্ব চাল ও কচি আমপাতা দিয়ে ভেজানো পানি তৈরি করতেন।
নববর্ষের সকালে সূর্যোদয়ের আগে ঘর ঝাড়ু দিয়ে সেই আমপাতার পানি উঠান ও ঘরে ছিটিয়ে দেয়া হতো। এরপর সেই ভেজানো ভাত পরিবারের সবাইকে খেতে দেয়া হতো। গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখা এবং আগের দিনের বাসিভাত অপচয় রোধের জন্য গ্রামবাংলার মানুষ এটি খেতেন।
পরবর্তীতে এটি ঢাকায় সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে পহেলা বৈশাখের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। গবেষকদের মতে, পান্তা ইলিশ আসলে পহেলা বৈশাখের মূল খাবার নয়; পান্তা বরং বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের চিরায়ত দৈনন্দিন খাবার। কালের পরিক্রমায় সেই সাধারণ পান্তা ভাতই শহরে সংস্কৃতির মোড়কে পান্তা-ইলিশ উদ্যাপনে রূপ নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক রাশেদা রওনক খান বলেন, শহরে যখন কোনও গ্রামীণ সংস্কৃতি আসে, তখন তা নানা পরিবর্তিত রূপে উপস্থাপিত হয়। চিরাচরিত পান্তার সঙ্গে ভালো মানের মাছ বা বিশেষ খাবার যুক্ত হয়ে শহুরে এলিট শ্রেণির কাছে তা পান্তা ইলিশে রূপ নেয়, যা অনেক সময় সামাজিক চাপও তৈরি করে।
তবে পান্তা ইলিশ যতটা না গভীর সংস্কৃতির অংশ, তার চেয়ে বেশি শহুরে চটুল ব্যবসায়িক অনুষঙ্গ বলেও মনে করেন অনেকে। তবুও পান্তা ভাত নিজে, তার সরল রূপে, বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়েই রয়ে গেছে।
বৈশাখের তপ্ত দুপুরে শরীরের ক্লান্তি দূর করার সহজ খাবার হিসেবে যে পান্তা একসময় বাঙালির জীবনের রসদ ছিল, সেটিই আজ ঐতিহ্যের প্রতীক। ইলিশ থাকুক বা না থাকুক, বাঙালির পাতে পান্তা ভাত তার সরলতা নিয়ে চিরকাল টিকে থাকুক-এমন প্রত্যাশাই করেন অনেকে।


