মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও আকাশপথের অনিশ্চয়তার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর–এ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। আকাশসীমা জটিল হয়ে পড়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, যার ফলে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি, পর্যটক ও ভ্রমণকারীরা। সর্বশেষ শুক্রবার নতুন করে আরও ৬টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪৫টিতে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় চলমান উত্তেজনা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী রুটগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে। এর মধ্যে শারজা, দুবাই এবং আবুধাবি রুটের ফ্লাইটগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব গন্তব্যে নিয়মিত চলাচলকারী একাধিক এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট সময়সূচি পরিবর্তন বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত ফ্লাইট বুলেটিন অনুযায়ী, নতুন করে বাতিল হওয়া ছয়টি ফ্লাইটের মধ্যে ছিল US-Bangla Airlines–এর একটি আগত ও একটি বহির্গামী ফ্লাইট। এছাড়া Air Arabia–এর শারজা থেকে আসা ও যাওয়ার দুটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। একইভাবে SalamAir–এর মধ্যপ্রাচ্যগামী একটি ফ্লাইট এবং সেখান থেকে চট্টগ্রামগামী আরেকটি ফ্লাইটও বাতিলের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক রুটগুলোতেই এই অচলাবস্থা বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ এসব রুটে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে হয়, আর বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক সময় বিকল্প রুট ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক ফ্লাইট পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হওয়ায় সময় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে।
তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি বিমান চলাচল। শুক্রবার বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মোট ৯টি আগত (অ্যারাইভাল) এবং ৬টি বহির্গামী (ডিপার্চার) ফ্লাইট সীমিত আকারে পরিচালিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু ফ্লাইট সীমিত পরিসরে চালু রাখা হচ্ছে, যাতে জরুরি যাত্রীদের ভ্রমণের সুযোগ থাকে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা ও আকাশসীমা সংকটের কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই বিমানবন্দর থেকে মোট ২৪৫টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি বিমান পরিবহন ব্যবস্থার ওপর পড়েছে। এর ফলে প্রবাসী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পর্যটকসহ নানা শ্রেণি-পেশার যাত্রীরা বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই নির্ধারিত সময়ের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিমানবন্দরে এসে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও নিশ্চিত হতে পারছেন না তাদের ফ্লাইট কখন চালু হবে।
বিমানবন্দর সূত্রে আরও জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী নিয়মিত যাতায়াত করেন। তাই এসব রুটে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন প্রবাসীরা। অনেকের ভিসার মেয়াদ, কর্মস্থলে যোগদানের সময় কিংবা জরুরি পারিবারিক কারণ থাকলেও তারা নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
এদিকে ভ্রমণ সংস্থাগুলো বলছে, যাত্রীদের টিকিট পুনঃনির্ধারণ, রিফান্ড এবং বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাদেরও ব্যাপক চাপ সামলাতে হচ্ছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বেড়ে গেছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে ধীরে ধীরে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত যাত্রীদের ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান সংকটের দ্রুত অবসান হবে—এই প্রত্যাশাতেই এখন অপেক্ষায় রয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, এয়ারলাইন্সগুলো এবং হাজারো যাত্রী। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে তবেই চট্টগ্রামের এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল আগের মতো ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


