সিএনএনের বিশ্লেষণ: মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি

সিএনএনের বিশ্লেষণ: মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৯টি দেশে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা প্রতিদিন অর্থনীতিতে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি করছে। বিশ্বের দেশগুলো একটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। কিন্তু এই যুদ্ধের মাত্রা আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি নানা কারণে যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান কয়েকটি কারণে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। প্রথমত, যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং তৃতীয়ত, মধ্যস্থতাকারী দেশের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের নিরাপত্তা চুক্তি থাকলে অস্ত্র তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা চুক্তি থাকায় এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

অন্যদিকে ইরানের প্রক্সি গ্রুপগুলো যেহেতু ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে ইসরায়েলের পক্ষ গণ্য করে দেশটিতে হামলা হতে পারে। সৌদি আরবের পাশাপাশি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক নিক্ষেপ করছে ইরান। তবুও এখন পর্যন্ত এই দেশগুলোর কোনোটিই তেহরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায়নি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ সাঈদ ব্যাখ্যা দেন, সৌদি আরব খুবই ধৈর্যশীল। যদি সৌদিরা সামরিকভাবে পাল্টা হামলা চালায়, তবে তা শুধু সৌদিরাই করবে না। তাতে পুরো অঞ্চলটিই আগুনে জ্বলে উঠবে।

গত রোববার ইসলামাবাদে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অসাধারণ সংযমের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এও আশ্বাস দেন, পাকিস্তান সব সময় সৌদি আরবের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে। এর তাৎপর্য হলো, যদি ইরান সৌদি আরবকে খুব বেশি উত্ত্যক্ত করে, তবে রিয়াদের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসতে পাকিস্তান বাধ্য হতে পারে।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো কামরান বোখারি মনে করেন, ইরানের কৌশলগত পরিমণ্ডলে ইরানের সবচেয়ে কম সমস্যাযুক্ত সম্পর্ক হলো পাকিস্তানের সঙ্গে। তবে পাকিস্তানের সংকটকালীন কূটনীতি আরও গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

গত সপ্তাহান্তে ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুতিরা এই সংঘাতে প্রবেশ করে এবং ইসরায়েলের দিকে তারা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যা আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও প্রসারিত করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে একটি ঐতিহাসিক শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাব।’

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের আবির্ভাব 
বিবিসি লিখেছে, এই সংঘাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনজরে আছেন। মার্কিন নেতা প্রায়ই তাঁকে তাঁর ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ট্রাম্প আগেও বলেছেন, মুনির ইরানকে অধিকাংশের চেয়ে ভালো চেনেন। যদিও দেশটিতে কোনো মার্কিন বিমানঘাঁটি নেই।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে বলেন, ‘আমি বলব, মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের অনেক বেশি স্বার্থ জড়িত। দেশটি নিজ স্বার্থের কারণেই উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা করছে।’ তবে এই কাজটি ঝুঁকিমুক্ত নয়। আঞ্চলিক কূটনীতিতে উভয় সংকট মোকাবিলার কৌশলই সর্বোত্তম পন্থা বলে মনে করে পাকিস্তান। এই পন্থা সফল না হলে ইসলামাবাদের জন্য সমীকরণ আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *