২০২১ থেকে ২০২৫—এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে দেশে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে ৪০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। ফলে দেখা যাচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচগুণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ২০২৫ সালে, যার পরিমাণ ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বিনিয়োগ ছিল ১ দশমিক ১.২৭ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এক বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৩৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে এফডিআই প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগে এবং ওই বছরই পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন বিনিয়োগ আসে। এর আগে টানা তিন বছর বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে—২০২১ সালে ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে ১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন এবং ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ কোনোভাবেই সন্তোষজনক নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আঙ্কটাড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেনটেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফডিআই আকর্ষণে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, মোট এফডিআই স্টকের দিক থেকে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ বাংলাদেশকে কয়েকগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালে এফডিআইয়ের যে অবস্থা ছিল, সেখান থেকে আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার একই রয়ে গেছে; বরং কিছুটা কমে গেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়াতে আমরা কাজ করছি, কিন্তু তা থেকে তেমন কোনো ফল আসছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে মোট বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ নেওয়া হয় ২০২১ সালে, যার পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। তবে পরবর্তী তিন বছরে ঋণ গ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়—২০২২ সালে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে, ২০২৩ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে এবং ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে হয় ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। তবে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ আবারও বেড়ে ৮ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ শতাংশ বেশি।
সরকারি খাতে ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বেসরকারি খাতে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগত বেড়েছিল। ২০২৪ সালে তা কিছুটা কমলেও ২০২৫ সালে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নিট এফডিআই ইকুইটি মূলধন প্রবাহ ছিল ৫ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে ২০২৪ সালে তা ছিল ৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নিট এফডিআই ইকুইটি মূলধন প্রবাহ সামান্য ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশে এফডিআই স্টক ছিল প্রায় ২০ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদেশি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জিডিপির অনুপাতে তা বাড়ছে। ২০২১ সালে দেশে বিদেশি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ।


