বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও সহায়তার অর্থ ছাড় হয়েছে, তার প্রায় পুরোটা পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধেই ব্যয় করতে হয়েছে সরকারকে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ছাড় হওয়া বৈদেশিক অর্থায়নের প্রায় ৯২ শতাংশই চলে গেছে আগের নেওয়া ঋণের দায় মেটাতে। ফলে নতুন উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য হাতে থাকছে খুবই সামান্য অর্থ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট ৩৮৯ কোটি ১ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অর্থ ছাড় হয়েছে। একই সময়ে সরকারকে পুরোনো বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিদেশি ঋণ থেকে নতুন করে সরকারের হাতে যুক্ত হয়েছে মাত্র ৩৬ কোটি ৬ লাখ ডলার। উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় এই পরিমাণ অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।
সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় এখন সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও একইভাবে বাড়ছে।
ইআরডির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। একই সঙ্গে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতিও কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে বিপরীতভাবে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন অর্থ প্রবাহ কমলেও ঋণের দায় পরিশোধের চাপ বাড়ছেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরে বিদেশি ঋণের অর্থছাড় কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক ধীরগতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি না ফেরার বিষয়গুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক প্রকল্প এখন পুনর্মূল্যায়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় রয়েছে। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অনুমোদিত অর্থও দ্রুত ছাড় হচ্ছে না। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণও দ্রুত বাড়ছে। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে ব্যাপকভাবে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। পরবর্তীতে আংশিক সমন্বয়ের ফলে সেই পরিমাণ কিছুটা কমে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, একদিকে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ—দুই দিকের চাপ একসঙ্গে বাড়তে থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, ঋণের পরিমাণ যত বাড়বে, স্বাভাবিকভাবেই সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও বাড়বে। প্রতিটি ঋণচুক্তির নির্দিষ্ট সময় শেষে কিস্তি পরিশোধ শুরু হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই দায় অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, গত এক দশকে ব্যাপক হারে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। শুধু আগের সরকার নয়, বর্তমান সময়েও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে সামগ্রিক ঋণের বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে।
ড. মুজেরি মনে করেন, ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হয় তখনই যখন ঋণের অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় না। তার ভাষায়, ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়, রপ্তানি আয় বাড়ে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, তাহলে ঋণ পরিশোধে বড় সমস্যা হয় না। কিন্তু ঋণের অর্থ অপচয়, দুর্নীতি বা অকার্যকর প্রকল্পে ব্যয় হলে সেই ঋণ অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির বহু অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হলেও তার অনুপাতে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে এখন ঋণ পরিশোধের চাপ তীব্র আকার ধারণ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নও ঋণের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ বিদেশি ঋণ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। গত দুই বছরে টাকার মান ৪০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় একই পরিমাণ ঋণ শোধ করতে এখন সরকারকে অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ ও আসল মিলিয়ে মোট ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করা হয়, যেখানে আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে রাশিয়া। দেশটি প্রায় ৮৩ কোটি ডলার দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যারা দিয়েছে প্রায় সাড়ে ৭৬ কোটি ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৬১ কোটি ডলার। এছাড়া চীন থেকে এসেছে প্রায় ৫২ কোটি ডলার, ভারত দিয়েছে ২৪ কোটি ডলার এবং জাপান দিয়েছে প্রায় ৩১ কোটি ডলার। এসব অর্থ মূলত চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২২ সালে তীব্র ডলার সংকট দেখা দেওয়ার পর তৎকালীন সরকার আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। পরবর্তীতে কঠোর শর্তে ঋণচুক্তি সম্পন্ন হয়। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। তবে এসব সংস্কারের প্রভাব এখনও পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২০ সালের পর থেকে দেশের অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখনও কাটেনি। করোনাপরবর্তী বৈশ্বিক সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের কারণে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ১৫ মাসে দেশের বৈদেশিক ঋণ আরও ৮ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঋণ ব্যবস্থাপনা টেকসই রাখতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।


