করছাড় বা কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে এখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতি অর্থবছরেই বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ করছাড় দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ সরকার হারাচ্ছে। এনবিআরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে শুধু আয়কর খাতেই করছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ দশমিক ৩৯ শতাংশের সমান।
এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই এসব করছাড় বা কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের মতে, করছাড়ের সুযোগ সবচেয়ে বেশি ভোগ করেন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বড় প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে প্রকৃত কর আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার অনেক সময় বঞ্চিত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেওয়া মোট করছাড়ের বড় অংশই গেছে করপোরেট বা প্রতিষ্ঠান খাতে। ওই অর্থবছরে করপোরেট খাতে মোট করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা, যা মোট করছাড়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট করছাড়ের প্রায় ৩১ শতাংশ সুবিধা পেয়েছেন ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা।
করপোরেট খাতের করছাড় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন শিল্প ও খাতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি করছাড় দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র ও সমাজকল্যাণমূলক খাতে। এই খাতে প্রায় ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা করছাড় দেওয়া হয়েছে, যা করপোরেট খাতে মোট করছাড়ের প্রায় ১৭ শতাংশ।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। শেয়ারবাজারে ক্যাপিটাল গেইন বা মূলধনী মুনাফা খাতে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা করছাড়। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও অ্যাকসেসরিজ শিল্প খাতে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা কর সুবিধা।
অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা করছাড়। লভ্যাংশ আয়ের ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪১ কোটি টাকা। অন্যদিকে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানিতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা।
তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাতেও কর প্রণোদনা অব্যাহত রয়েছে। এই খাতে করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা করছাড়। একইভাবে পোলট্রি ও মৎস্য খাতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।
এসব নির্দিষ্ট খাতের বাইরে অন্যান্য বিভিন্ন খাতে করছাড়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, বিভিন্ন খাতের বিনিয়োগ ও ব্যবসা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে বিপুল অঙ্কের কর অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের করছাড় দেওয়া হয়েছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির মোট করছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি করছাড় দেওয়া হয়েছে বেতন আয়ের ক্ষেত্রে, যার পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া পোলট্রি ও মৎস্য খাতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা করছাড়। শেয়ারবাজারে ক্যাপিটাল গেইন থেকে প্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে অন্যান্য বিভিন্ন খাতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা করছাড় পেয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
এনবিআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে করছাড় দেওয়া হলেও এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কিছু শিল্প খাত একসময় করছাড়ের মাধ্যমে দ্রুত বিকশিত হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রেই এসব সুবিধার প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পসহ কিছু বড় খাত ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ফলে এসব খাতে আগের মতো কর অব্যাহতি দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে করছাড়ের সুযোগ নিয়ে প্রকৃত বিনিয়োগের বদলে কিছু প্রতিষ্ঠান অযথা সুবিধা ভোগ করছে। এর ফলে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পেতে পারত, তার একটি বড় অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।
মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ কর্মসূচির শর্ত হিসেবেও করছাড় কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোন খাতে কত করছাড় দেওয়া হয় তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব তুলে ধরতেই এনবিআর ‘ট্যাক্স এক্সপেনডিচার’ বা কর ব্যয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। এতে শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং কর্মসংস্থান বাড়ে। তাদের মতে, করছাড়ের কারণে স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব ক্ষতি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছেন, অপ্রয়োজনীয় করছাড় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই একটি সংস্কার কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সংস্কার পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যেসব খাতে করছাড়ের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে বা যেগুলো অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত সুফল দিচ্ছে না, সেসব কর অব্যাহতি ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে নতুন কর প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় অগ্রাধিকার খাতগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতের প্রবৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো। অর্থনীতির এসব অগ্রাধিকার খাতের সঙ্গে কর প্রণোদনা সমন্বয় করা গেলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এনবিআর বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করছাড় কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে গত কয়েক বছরে করছাড়ের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে মোট করছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তা কমে ২০২২–২৩ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে করছাড় কমেছে প্রায় ১৮ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা।
তবে করছাড় কমলেও দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও বিশ্বের সবচেয়ে কমগুলোর মধ্যে রয়েছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৩০ শতাংশের কিছু বেশি। পরবর্তী অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে নেমে আসে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২২–২৩ অর্থবছরে মোট আয়কর আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ যে পরিমাণ কর আদায় হয়েছে, তার প্রায় সমপরিমাণ অর্থ করছাড় হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
জিডিপির হিসাব অনুযায়ীও করছাড়ের পরিমাণ এখনও বড়। ২০২২–২৩ অর্থবছরে এটি ছিল জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। যদিও ২০২০–২১ অর্থবছরে করছাড়ের পরিমাণ আরও বেশি ছিল এবং তখন তা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করছাড়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে একই সঙ্গে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোও জরুরি। তা না হলে করছাড়ের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় সুবিধা ভোগের ঝুঁকি থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে করছাড় নীতিতে সংস্কার এনে ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমিয়ে আনা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।


