বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধারে বড় উদ্যোগ, জালিয়াতদের নিষেধাজ্ঞা

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্লাইড

 

দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে একটি বড় আকারের বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণীত খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, এই তহবিলের আকার প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো বাজারভিত্তিক সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান করবে। তবে ঋণের সুদের একটি অংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে—প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম বছরে ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি সুদের অংশ গ্রাহকদের বহন করতে হবে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুদ ভর্তুকির বিষয়ে সম্মতি দিলে তহবিলটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে।

তবে এই তহবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি কিংবা অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনোভাবেই এই সুবিধার আওতায় আনা হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যেসব ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে কিংবা মামলা রয়েছে, তারা এই তহবিল থেকে ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারাবে।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানার একটি প্রাথমিক তালিকা সংগ্রহ করেছে। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, শুধুমাত্র সেইসব কারখানাই এই তহবিলের আওতায় আসতে পারবে, যেগুলো মালিকের ইচ্ছাকৃত অবহেলা বা আর্থিক অনিয়মের কারণে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন—জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

কারখানাগুলোর আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিদ্যমান আছে কি না, যন্ত্রপাতি সচল অবস্থায় রয়েছে কি না, পূর্বে নেওয়া ঋণের অর্থ অন্যত্র স্থানান্তরের কোনো অভিযোগ আছে কি না, এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক আচরণ কতটা স্বচ্ছ ছিল—এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন করা হবে।

এই তহবিল থেকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—তিন ধরনের ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। বিশেষভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কারণ এই খাতটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া কারখানা চালু করার পর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে এলসি খোলাসহ অন্যান্য ব্যাংকিং সুবিধাও প্রদান করা হবে।

এই উদ্যোগটি মূলত বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা তার অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদের নেতৃত্বে গঠিত ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এই তহবিল গঠনের প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। কমিটিটি বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করেছে।

অন্যদিকে, দেশের কিছু বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ঋণ জালিয়াতি ও কর ফাঁকির অভিযোগে তদন্ত চলছে। প্রায় ১০টি বড় গ্রুপের বিরুদ্ধে চারটি সংস্থার সমন্বয়ে একটি যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর নাম রয়েছে—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান। এসব প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট ব্যাংককে ‘লিড ব্যাংক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি আইনি সহায়তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে অপ্রকাশ চুক্তি (এনডিএ) সই করে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, এই তহবিলের আওতায় ঋণ পেতে হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, গ্রাহকের ঋণ হিসাব নিয়মিত থাকতে হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানা পুনরায় চালুর স্বার্থে ডাউনপেমেন্ট সংক্রান্ত কিছু শর্ত শিথিল করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, যাতে উদ্যোক্তারা সহজে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারেন।

তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওপরই নির্ভর করবে। কারণ, পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হলেও সেই অর্থের দায়ভার শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোকেই বহন করতে হয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করে নেয়। ফলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি বিবেচনা করে গ্রাহক নির্বাচন করবে এবং ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন করে এ ধরনের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনে কিছুটা আপত্তি জানিয়েছে। সংস্থাটির সঙ্গে চলমান প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির একটি শর্ত হলো—নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল না গঠন করা এবং বিদ্যমান তহবিলগুলো ধীরে ধীরে সংকুচিত করা। ইতোমধ্যে এই শর্তের অংশ হিসেবে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ)-এর আকার কমানো হয়েছে এবং অন্যান্য তহবিলের মেয়াদ বাড়ানো থেকে বিরত থাকা হয়েছে।

আইএমএফের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি অর্থায়ন বাজারে অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি করতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্প পুনরুজ্জীবনের জন্য এই ধরনের বিশেষ তহবিল প্রয়োজন। এ বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে সমঝোতার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই তহবিল দেশের শিল্পখাতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু হলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পাবে। তবে একই সঙ্গে আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের কঠোরভাবে বাইরে রাখা গেলে এই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা আরও বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *