আইএমএফ ঋণে অনিশ্চয়তা, বিকল্প পথে সরকার

অর্থনীতি স্লাইড

 

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা, আর্থিক খাতে প্রত্যাশিত সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—International Monetary Fund (আইএমএফ)—এর কাছ থেকে বাংলাদেশের ঋণপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। ফলে শুধু চলমান ঋণ কর্মসূচির কিস্তি নয়, অতিরিক্ত বাজেট সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার একদিকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখলেও অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের একটি কিস্তি ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও তা বিলম্বিত হচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে—রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে অগ্রগতির অভাব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার উদ্যোগের স্থবিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের কিছু নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্য।

এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর, যা সরকারি কোষাগারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার অর্থের জোগান নিশ্চিত করার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার।

এই দ্বিমুখী চাপ—একদিকে আইএমএফ ঋণ অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি—মোকাবিলায় সরকার বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজছে। ইতোমধ্যে World Bank (বিশ্বব্যাংক), Asian Infrastructure Investment Bank (এআইআইবি) এবং Asian Development Bank (এডিবি)-সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছে মোট প্রায় ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড অব গভর্নরসের বসন্তকালীন সভা শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী Amir Khasru Mahmud Chowdhury জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুতে এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে এবং আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে এআইআইবির কাছে ৭৫ কোটি ডলার সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলেছে। এছাড়া এডিবির কাছ থেকে মোট ১০০ কোটি ডলার (৭৫০ মিলিয়ন ও ২৫০ মিলিয়ন) সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা Japan International Cooperation Agency (জাইকা) থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ৫০ কোটি ডলার সহায়তা চাইলেও জাইকা তা দিতে অপারগতা জানিয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য তারা আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্যে জাইকার একটি প্রতিনিধিদল আগামী ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সফর করবে বলে জানা গেছে, যেখানে প্রায় ১২০ কোটি ডলারের একটি সম্ভাব্য সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া তুলনামূলকভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর Nazrul Huda মনে করেন, বৈদেশিক ঋণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য বজায় রাখে। তিনি বলেন, একই পরিমাণ অর্থ যদি দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাহলে তা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তৈরি হয়, যেখানে সরকারি ঋণগ্রহণ বাড়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যায়। এতে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করে, তাহলে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

অন্যদিকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। কারণ আইএমএফ কর্মসূচি চালু থাকলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও সহজে ঋণ সহায়তা দিতে আগ্রহী থাকে। বিপরীতে আইএমএফ কর্মসূচি স্থগিত বা বাতিল হলে অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই সরকার কৌশলগতভাবে একদিকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পথও উন্মুক্ত রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, আইএমএফ মূলত তিনটি কারণে ঋণের কিস্তি ছাড়ে বিলম্ব করছে—প্রথমত, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধিতে ব্যর্থতা; দ্বিতীয়ত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে কার্যকরভাবে পৃথক ও আধুনিকীকরণের উদ্যোগে ধীরগতি; এবং তৃতীয়ত, ব্যাংক রেজল্যুশন সংক্রান্ত নতুন আইনের কিছু ধারা নিয়ে তাদের আপত্তি। এসব বিষয়ে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত ঋণ ছাড়ে বিলম্ব অব্যাহত থাকতে পারে।

এছাড়া ভর্তুকি নীতি নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে আইএমএফের চাপ থাকলেও সরকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ধীরে এগোতে চায়। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ঋণ ছাড়ের ওপর।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হবে এবং বাজেট ঘাটতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। ফলে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একদিকে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সংস্কার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে শুধু ঋণ সংগ্রহ নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাও সমান জরুরি।

সব মিলিয়ে, আইএমএফ ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ একটি জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে কৌশলগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সময়োপযোগী সংস্কার এবং বহুমুখী অর্থায়ন উৎসের সমন্বয়ই হতে পারে সংকট মোকাবিলার প্রধান পথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *