অতি ধনীদের করহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা

অতি ধনীদের করহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা

অর্থনীতি স্লাইড

 

দেশের অতি ধনীদের ওপর আয়করের হার বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ করহার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিধি বাড়ানো এবং করব্যবস্থায় অধিক সাম্য আনার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সদর দপ্তরে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় তিনি এ তথ্য জানান। আলোচনায় আসন্ন বাজেট এবং ভবিষ্যৎ করনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের মধ্যে অতি ধনী বা ‘সুপার রিচ’ শ্রেণির ওপর উচ্চতর করহার আরোপের একটি পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ থাকলেও সেটি বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এই করহার সব করদাতার জন্য নয়, বরং উচ্চ আয়ের নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।

তিনি জানান, এই নতুন করহার অবিলম্বে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেই। বরং আগামী অর্থবছরের পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৭–২৮ অর্থবছর থেকে এটি কার্যকর করার চিন্তা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী অর্থবছরের পরের বছর থেকে এই করহার কার্যকর করার। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে দেওয়া হবে। সরকার যদি অনুমোদন দেয়, তাহলে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।’

অতি ধনী বলতে কোন শ্রেণির করদাতাদের বোঝানো হবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো চূড়ান্ত কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে যেসব করদাতার বার্ষিক আয় ১ কোটি টাকা, দেড় কোটি টাকা বা ৫ কোটি টাকার বেশি—এমন কোনো একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে সেই আয়ের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিদের ‘সুপার রিচ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। সেই শ্রেণির ওপরই বাড়তি করহার আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক দেশেই অতি ধনীদের ওপর তুলনামূলক বেশি করহার আরোপ করা হয়। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ে, অন্যদিকে করব্যবস্থায় কিছুটা ভারসাম্য তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নীতি অনুসরণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও ন্যায্য করার জন্য সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবেই উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর কিছুটা বেশি করহার আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে, যাতে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান আরও বাড়ে।

সভায় আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি জানান, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনকে আধুনিক করা এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা জোরদার করার মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে তামাকজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে তামাকজাত পণ্যের মূল্য বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে নতুন পদক্ষেপ দেখা যেতে পারে।

তিনি বলেন, তামাক ব্যবহার কমাতে মূল্য বৃদ্ধিকে একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমসহ সংগঠনের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা করব্যবস্থার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন এবং করদাতাদের জন্য সেবা সহজ করার বিষয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন। এনবিআর এসব সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অতি ধনীদের ওপর করহার বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি নতুন উৎস তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি করব্যবস্থায় ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের ধারণাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *