ঈদে ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন যে পাঁচ জায়গায়

ঈদে ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন যে পাঁচ জায়গায়

ফিচার স্পেশাল

অফিস পাড়াতে ছুটির ঘণ্টা বেজেছে আগেই। ঘরে ঘরে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ঈদ প্রস্তুতি। সবমিলিয়ে সব পরিবারেই ঈদের আনন্দময় আবহ তৈরি হয়েছে।

ঈদের ছুটি মানে কিছু মূল্যবান অবসর সময়, স্কুল বা অফিসের চাপ নেই, পরিবারের সঙ্গে নিজের মতো করে সময় কাটানো যায়। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে জনাকীর্ণ শহর থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে শান্তিপূর্ণ মুহূর্ত উপভোগ করা যায়।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য আধার। সমুদ্র, বন, পাহাড়—সব মিলিয়ে আমাদের এই ভূ-খণ্ডে রয়েছে নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যা ব্যস্ততার ভিড়ে আমাদের মানসিক প্রশান্তি এনে দেয় এবং নতুন করে যেন প্রাণশক্তির সঞ্চার করে।

এবারের ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যেতে পারেন পাঁচ অসাধারণ স্থানে। নিশ্চয়ই এসব জায়গায় গেলে দারুণ কিছু সময় কাটবে।

কক্সবাজার

ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা উঠলেই প্রথমেই মনে পড়ে কক্সবাজারের নাম। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হিসেবে পরিচিত এই স্থানটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।

সামনে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দিগন্তজোড়া নীল আকাশ, প্রকৃতির এই অপূর্ব মিশেল ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করে। তাই ছুটির সময়গুলোতে এখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে, যারা এই সৌন্দর্য কাছ থেকে উপভোগ করতে আসে।

তবে কক্সবাজারের সব সৈকত একরকম নয়। কিছু কিছু সৈকতে ভিড় বেশি হলেও, কিছু সৈকত রয়েছে তুলনামূলক নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ যেখানে প্রকৃতিকে উপভোগ করা যায়।

ভাবুন তো, দিনের শুরুটা যদি এমন হয় যে ভোরের নরম আলোয় সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে, হালকা পানিতে পা ভিজিয়ে বুকভরে শ্বাস নিচ্ছেন। আর দিনের শেষে পড়ন্ত বিকেলের মৃদু বাতাসে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে যাওয়ার অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করছেন।

সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় সাগরপাড় ধরে হেঁটে চলার অনুভূতিই আলাদা। তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করে, যেন জীবনের জটিল হিসেব-নিকেশগুলোও হঠাৎ করেই সহজ হয়ে যায়।

কক্সবাজার থেকে হিমছড়ির দিকে এগোলে পথের বামপাশে সারি সারি পাহাড় যেন প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ঝিরিঝিরি ঝরণার স্রোত। আর ডানপাশজুড়ে বিস্তৃত সমুদ্রের জলরাশি ও সৈকত। মেরিন ড্রাইভ রোডে গেলে এই দৃশ্যটি দারুণভাবে উপভোগ করা যায়।

শ্রীমঙ্গল

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপার ভাণ্ডার। পুরো এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অনন্য শান্ত পরিবেশ, যা মুহূর্তেই মনকে প্রশান্ত করে তোলে।

ব্যস্ত নগর জীবনের কোলাহল থেকে দূরে এই নীরব প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক আনন্দ। যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর সবুজে মোড়া চা বাগানের অপরূপ বিস্তার।

এই আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে সকালে চা বাগানে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। সকালের মৃদু ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসে তাজা চা পাতার মিষ্টি ঘ্রাণ, আর এর ওপর যখন রোদ এসে পড়ে পাতাগুলো চকচক করতে থাকে।

এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে ঘুরতে অনেক সময় বানর, বিরল প্রজাতির নানা পাখি এবং গাছেরও দেখা মিলে যেতে পারে। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলো আমাদের বেঁচে থাকার জন্য নতুনভাবে যেন রিচার্জ করতে থাকে।

বান্দরবান

প্রকৃতি কে না ভালোবাসে! আর এর পাশাপাশি আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হয়ে থাকেন তাহলে বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে নিরাশ করবে না।
ব্যস্ত শহরের কোলাহলময় জীবন থেকে দূরে, এখানে আপনি খুঁজে পাবেন এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা, যা স্মৃতির ঝুলিতে এক সুখকর অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বান্দরবানে যাওয়ার পথটিও কম অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ নয়। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগোতে এগোতে মনে হবে যেন ধীরে ধীরে মেঘের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছেন।

নীলগিরি ও নীলাচলে গেলে পাহাড়ের উপরে ভাসমান মেঘগুলোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। তখন মনে হবে যেন আপনি মেঘের রাজ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।

ঈদের ছুটিতে যদি কোনো পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটি কুটিরে রাত কাটান, তবে ভোরে ঘুম ভাঙবে সবুজে মোড়া পাহাড় আর নির্মল-স্নিগ্ধ বাতাসের স্পর্শে, যা শরীর ও মনকে দেবে এক অনন্য প্রশান্তি।

এছাড়াও বান্দরবানে রয়েছে সাঙ্গু নদী, ঝর্ণা, লেক ও দুর্গম পাহাড়ি পথ; যেগুলো প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ করে দেয়। শুধু প্রকৃতিই নয়, এখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আপনার ভ্রমণকে করে তুলবে আরও সমৃদ্ধ ও স্মরণীয়।

তেঁতুলিয়া

উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীর তীরে অবস্থিত তেঁতুলিয়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য নাম। বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত, চা-বাগান এবং গ্রামীণ পরিবেশে ঘেরা এই অঞ্চল ভ্রমণকারীদের জন্য এনে দেয় এক ভিন্নধর্মী প্রশান্তি।

নদীর পাড় থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায় এখানে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে অবস্থিত হিমালয়ের চূড়াও কখনো কখনো চোখে পড়ে, যা সত্যিই এক বিরল ও অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

এখানকার গ্রামীণ জনজীবন শহরের মতো ব্যস্ত নয়। সময় যেন এখানে কিছুটা ধীর গতিতেই চলে। এখানকার আবহাওয়াটা দারুণ। ভ্রমণের অবসর মুহূর্তগুলো শীতল বাতাসে আরও প্রশান্তিময় হয়ে ওঠে।

আপনি যদি নির্জনতা ও শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তবে ভ্রমণের তালিকায় তেঁতুলিয়া অবশ্যই আপনার প্রথম পছন্দ হতে পারে।

নেত্রকোনা

নেত্রকোনাকে ট্রাভেল ডেস্টিনেশন হিসেবে শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হচ্ছেন। ভাবছেন, ঈদের ছুটিতে নেত্রকোনায় কেন ঘুরতে যাবেন? বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এই এলাকা চায়না ক্লে পাহাড়ের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। শুধু তাই নয়, পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন নদী ও জলাশয়। এখানে একটি গ্রামীণ পরিবেশ বিরাজমান।

নেত্রকোনার বিরিশিরি লেকটির চারপাশে পাহাড় ঘেরা এবং লেকের পানি হালকা নীলাভ সবুজ রঙের, যা সৌন্দর্যপ্রেমীদের জন্য এক অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি করে।

ট্রেকিং হয়তো আপনি ভালোবাসেন না, কিন্তু সবুজ বনভূমি আর পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য আপনি উপভোগ করতে ভালোবাসেন, তাহলে এই ঈদে নেত্রকোনা একবার ঘুরে আসার জন্য দারুণ জায়গা হতে পারে। এখানকার চারপাশের নীরবতায় যেন প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

ঈদ মানেই প্রিয় মানুষদের সঙ্গে আনন্দঘন মুহূর্ত কাটানো। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রকৃতির মাঝে অবকাশ যাপন করা এই ঈদে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হতে পারে। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্ত কাটানো যাবে, যা স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।

তাছাড়া, প্রকৃতি আমাদের মাঝে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে, যা পুরোনো দিনের ক্লান্তি ও রুটিন জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে শক্তি যোগাবে।

সূত্র: ডেইলি স্টার বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *