বাজেট ২০২৬-২৭: গ্রাম পর্যন্ত ভ্যাটের জাল, আসছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’

বাজেট ২০২৬-২৭: গ্রাম পর্যন্ত ভ্যাটের জাল, আসছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’

অর্থনীতি বিশেষ প্রতিবেদন স্পেশাল

 

দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। একসময় যেসব পণ্য ও সেবা কেবল জেলা শহর বা বিভাগীয় শহরে পাওয়া যেত, এখন তা ইউনিয়ন ও গ্রামের বাজারেও সহজলভ্য। গ্রামাঞ্চলে গড়ে উঠেছে আধুনিক মুদি দোকান, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, কাপড়ের শোরুম, কসমেটিকস ও মোবাইলের দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, রড-সিমেন্টের ডিলারশিপ, এমনকি গাড়ির শোরুমও। কিন্তু এই বিশাল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বড় অংশ এখনও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নেটের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হলেও সরকার সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে নতুন একটি ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এর নাম দেওয়া হচ্ছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’। মূলত শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ প্রক্রিয়ায় ভ্যাটের আওতায় আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের অন্তত ১০ লাখ নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নেটের আওতায় চলে আসতে পারে।

নতুন এই ব্যবস্থায় যেসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকার নিচে, তারা সহজ শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জটিল হিসাবপত্র সংরক্ষণ বা মাসিক বিস্তারিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে হবে না। বরং ব্যবসার ধরন, অবস্থান ও আকার অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠান নিজেই অনলাইনে বিআইএন বা ভ্যাট নিবন্ধন নিতে পারবে এবং বিকাশ, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ভ্যাট জমা দিতে পারবে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার জন্য এক ধরনের ভ্যাট হার নির্ধারণ করা হবে। অন্য সিটি করপোরেশন, জেলা শহর, উপজেলা বাজার ও ইউনিয়ন পর্যায়ের ব্যবসার জন্য আলাদা হার নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ রাজধানীর একটি দোকান এবং গ্রামের একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ভ্যাট হার থাকবে না। স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে ভ্যাটের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।

সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে সর্বনিম্ন ভ্যাটের পরিমাণ এক হাজার টাকা থেকে শুরু হতে পারে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ব্যবসার আকার ও বার্ষিক টার্নওভার যাচাই করবেন। এরপর সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণ করা হবে। তবে প্রথম বছর থেকেই কঠোরভাবে আদায় করা হবে না। ধীরে ধীরে ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন শুধুমাত্র জটিল প্রক্রিয়ার কারণে। নিয়মিত হিসাব খাতা সংরক্ষণ, মূসক ফরম পূরণ, মাসিক রিটার্ন জমা দেওয়া— এসব বিষয় অনেক ছোট ব্যবসায়ীর জন্য কঠিন। ফলে তারা স্বেচ্ছায় ভ্যাট ব্যবস্থায় আসতে চান না। নতুন ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ পদ্ধতিতে এসব জটিলতা না থাকায় লাখ লাখ ছোট ব্যবসায়ী সহজেই ভ্যাট নেটের আওতায় চলে আসবেন বলে আশা করছে এনবিআর।

বর্তমানে দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ লাখ ১৬ হাজার। ভ্যাট নেট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা বার্ষিক ৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ লাখ টাকায় নামিয়ে এনেছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসছে। এনবিআরের লক্ষ্য, আগামী এক বছরের মধ্যে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করা।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের ৪৬৫টি বণিক সমিতিকে সদস্যদের তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করছে মাত্র প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নেওয়ার পরও কার্যকরভাবে ভ্যাট দিচ্ছে না। এনবিআর মনে করছে, নতুন সহজ পদ্ধতি চালু হলে নিয়মিত ভ্যাট প্রদানের প্রবণতাও বাড়বে।

বাংলাদেশে ভ্যাট ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে প্রথম মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন প্রণয়ন করা হয়। পরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য ২০০৪-০৫ অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ চালু করা হয় এবং ২০০৬ সাল থেকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। সে সময় ব্যবসায়ীরা এই ব্যবস্থাকে স্বাগত জানালেও ধীরে ধীরে এর নানা দুর্বলতা সামনে আসে।

অর্থনীতিবিদ ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ হলেও বড় ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির সুযোগ তৈরি করেছিল। অনেক বড় শোরুম ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের ছোট ব্যবসায়ী হিসেবে দেখিয়ে বছরে মাত্র কয়েক হাজার টাকা ভ্যাট দিয়ে পার পেয়ে যেত। প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করলেও সরকার রাজস্ব পেত না। ফলে রাজস্ব আদায়ে প্যাকেজ ভ্যাটের অবদান ছিল খুবই সীমিত।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার। এর বড় অংশই ছিল প্যাকেজ ভ্যাটের আওতাভুক্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও প্যাকেজ ভ্যাট খাত থেকে বছরে আদায় হতো মাত্র ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান বছরে মাত্র ১৪ হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা ভ্যাট দিত। আবার কোনো কোনো এলাকায় এই হার ছিল মাত্র ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এতে স্পষ্ট হয় যে, প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থায় সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় নামমাত্র ছিল।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে আধুনিক ও অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ১ জুলাই নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ কার্যকর করা হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করা হয়।

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্যাকেজ ভ্যাট বাতিলের পর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় অংশ আবারও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে চলে যায়। এনবিআর এখন মনে করছে, জটিল নিয়মের পরিবর্তে সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি চালু না করলে তৃণমূল পর্যায়ে ভ্যাট আদায় সম্ভব নয়। তাই পুরোনো প্যাকেজ ভ্যাটের পরিবর্তিত ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবেই ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’ ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মধ্যে কিছু সংশয়ও রয়েছে। তাদের মতে, সঠিক তদারকি না থাকলে নতুন ব্যবস্থাও প্যাকেজ ভ্যাটের মতো অপব্যবহারের শিকার হতে পারে। বড় ব্যবসায়ীরা আবারও নিজেদের ছোট ব্যবসা হিসেবে দেখিয়ে কম ভ্যাট দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এজন্য ডিজিটাল তদারকি, অনলাইন লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং মাঠ প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে— সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি না করে কীভাবে কার্যকরভাবে ভ্যাট নেট বাড়ানো যায়। যদি সহজ নিবন্ধন, স্বল্প ভ্যাট, ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত লাখ লাখ ছোট ব্যবসা প্রথমবারের মতো সরাসরি জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *