চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আবারও নতুন ইতিহাস গড়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটির এই টার্মিনালে একদিনে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় মোট ৫ হাজার ৭০৯ টিইইউএস (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা এনসিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল মিলিয়ে একদিনে মোট ১০ হাজার ১৬২ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, বরং দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য সক্ষমতা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অগ্রগতির প্রতীক।
শুক্রবার (১ মে) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিন দিন তার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানে আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। তার ভাষায়, এই রেকর্ড প্রমাণ করে যে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অপারেশনাল সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা সম্ভব হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এক লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও টার্মিনাল অপারেটরদের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে গত ৩০ এপ্রিল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজার ৭০৯ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হয়েছে। এটি শুধু এনসিটির নয়, দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য খাতের জন্যও একটি বড় অর্জন। একই দিনে বন্দরের অন্যান্য টার্মিনালসহ মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৬২ টিইইউএসে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতিফলন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে দ্রুত ও দক্ষ কনটেইনার হ্যান্ডলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজ দ্রুত খালাস ও পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করতে পারলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমে আসে, ব্যবসায়ীদের সময় সাশ্রয় হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই নতুন রেকর্ড দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বলে মনে করছেন তারা।
এর আগে চলতি মাসের ১১ এপ্রিল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে একদিনে ৫ হাজার ৪৮৪ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এনসিটি। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এই ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রমাণ করে যে বন্দরের সক্ষমতা ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং অপারেশন ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি এসেছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহন হচ্ছে। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের কার্যক্রমে সামান্য ধীরগতিও দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কনটেইনার জট কমানো এবং জাহাজের অপেক্ষার সময় কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল কেন্দ্র। আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত ক্রেন ব্যবস্থা এবং দক্ষ অপারেটরদের মাধ্যমে এখানে দ্রুত কনটেইনার ওঠানামার ব্যবস্থা করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির কারণেই এমন রেকর্ড সম্ভব হয়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী ও শিপিং এজেন্টরাও এই অর্জনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দ্রুত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ফলে জাহাজের অবস্থানকাল কমে আসবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচও কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রবন্দরের ওপর চাপও দ্রুত বাড়ছে। তৈরি পোশাক, শিল্প কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য এবং যন্ত্রপাতির আমদানি-রপ্তানি বাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাই বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই রেকর্ড সেই সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বাস্তব উদাহরণ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ এবং অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা আরও বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের বড় অংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন্দরের কার্যক্রম যত দ্রুত ও কার্যকর হবে, অর্থনীতির গতিও তত বাড়বে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই অর্জন শুধু একটি দিনের সাফল্য নয়; বরং এটি চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রচেষ্টার ফল। সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পণ্য পরিবহন সহজ করা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের এই নতুন রেকর্ড সেই অগ্রযাত্রারই একটি বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


