কুমিল্লায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর এক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ষষ্ঠ) আদালতের বিচারক আবিদা সুলতানা (মলি) এ আদেশ দেন। একই দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় চার আসামির জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) টিটু কুমার নাথ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া চার আসামি হলেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার মৃত নুর ইসলামের ছেলে মো. সোহাগ (৩৪), মৃত সজল মিয়ার ছেলে মো. সুজন (৩২), আমড়াতলী এলাকার আমির হোসেনের ছেলে এমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪) এবং আড়াইওড়া এলাকার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে রাহাত হোসেন ওরফে জুয়েল (২৭)। অন্যদিকে ধর্মপুর এলাকার মৃত হারুন মিয়ার ছেলে ইসমাইল হোসেন ওরফে জনিকে (২৮) তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে রোববার রাতে কুমিল্লা নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলন শেষে বিকেলে গ্রেপ্তার পাঁচজনকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে তাঁদের আদালতে নেওয়া হয়।
আদালত ও থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই টিটু কুমার নাথ আসামি ইসমাইল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অপর চার আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন। পরে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই টিটু কুমার নাথ বলেন, আদালতে হাজির করার পর পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ইসমাইল হোসেন জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলছিলেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রাতেই তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
র্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লার কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম জানান, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে করে কুমিল্লায় পৌঁছান। বাস থেকে নামার পরপরই তিনি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের কবলে পড়েন। আগে থেকেই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে কয়েকজন অবস্থান করছিল। পরিকল্পিতভাবে তাঁকে ওই অটোরিকশায় তোলা হয় এবং পরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালানো হয়। একপর্যায়ে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
র্যাব কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনার পরপরই র্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। এরপর কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে চারজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। অপর আসামি সুজন সহযোগীর ভূমিকা পালন করেন। তাঁর কাছ থেকেই নিহত বুলেট বৈরাগীর ব্যবহৃত মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারের সময় আসামিদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, ঘটনায় ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং নিহত কর্মকর্তার লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত তদন্তের স্বার্থে জব্দ করা হয়েছে।
নিহত বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরির কারণে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সহকর্মী ও স্বজনদের ভাষ্য, তিনি শান্ত স্বভাবের ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সহকর্মীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে রিমান্ডে থাকা আসামিকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


