ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬-এ একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ব্যতিরেকে আবারো ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগের বিধান যুক্ত করার মাধ্যমে সরকার চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশে’ ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। কিন্তু নতুন ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইনে’ ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে সেই অবস্থান বদলে দেওয়া হয়েছে। সরকার যে যুক্তিই দেখাক না কেন, ‘দুর্নীতি, লুটপাটে সহায়ক ও সুরক্ষাকারী’ এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা দূরে থাক, বিশালভাবে ‘পুরস্কৃত’ করা হল; যা আত্মঘাতীমূলক।”
তিনি বলেন, ‘সরকারের এ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হলেও অবাক করার মতো তেমন কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ যে ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়, বরং “উইনার টেইকস অল” ফর্মুলায় নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম রাখা, সরকারের এ পদক্ষেপ তারই দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা মাত্র।’
টিআইবি বলছে, নতুন আইনের এই পরিবর্তনের ফলে দুর্বল বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীরা আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ পাবেন। যদিও এর আগে অধ্যাদেশে সেই পথ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সংস্থাটির দাবি, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি কাটাতে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার বদলে এই আইন উল্টো ‘পুনর্বাসনের’ পথ তৈরি করেছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংকটে নিমজ্জিত ব্যাংকগুলোর আগের মালিকরা যারা এ খাতের লুটপাটের ‘পাইওনিয়ার’, তারাই বা কোন জাদুবলে এমন শুদ্ধতা অর্জন করলেন যে, একই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ইত্যাদি পুনরায় করায়ত্তের জন্য সরকার নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ জমা দিবেন, বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরে মাত্র ১০ শতাংশ সুদসহ শোধ করবেন!
তিনি বলেন, নতুন মূলধন যোগান দেবেন! বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ করবেন! আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবেন! সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবে! ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবেন এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুনের কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবেন? এ প্রশ্নের উত্তর কি সরকারের কাছে আছে?
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তা ছাড়া কোন মানদণ্ডে পুনর্দখলের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হবে? অধিকন্তু ব্যাংক পুনর্দখলের পর ঘোষিত শর্তাবলী বাস্তবে প্রতিপালিত হবে, এমন নিশ্চয়তা স্বার্থের দ্বন্দ্বে দুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হবে, তা বোধগম্য নয়।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ঘোষিত শর্ত পূরণের নামে নতুন করে ঋণ আদায় বা ঋণখেলাপির চলমান সংস্কৃতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতে আরও ‘গভীর দেউলিয়াপনার’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হবে।
বিবৃতিতে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নামে দুর্নীতিসহায়ক নতুন বিধান যুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠার জোরে যে আইনটি সংসদে পাস করেছে। তা কি আদৌ ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছে, তা প্রতিপালনে সহায়ক হবে! নাকি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষায় এ জাতীয় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে! এ ব্যাপারে সরকারকে পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।
সূত্র : সমকাল


