বাজেট ২০২৭৬-২৭: কর অব্যাহতি কমছে, কঠোর হচ্ছে রাজস্ব নীতি

বাজেট ২০২৭৬-২৭: কর অব্যাহতি কমছে, কঠোর হচ্ছে রাজস্ব নীতি

অর্থনীতি স্লাইড

 

আসন্ন জাতীয় বাজেটে ভ্যাট ও আমদানি শুল্কে নতুন করে ছাড় দেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে বলে জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কর অব্যাহতি সুবিধা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব তথ্য তুলে ধরেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

সভায় তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট বা আমদানি শুল্কে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করে জানান। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে দেওয়া কর অব্যাহতি বা ট্যাক্স এক্সেম্পশন সুবিধা পুনর্বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে তা প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক খাতে ব্যয় মেটাতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব প্রয়োজন। এজন্য আগামী সময়ের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহ করতে হলে কর ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা, কর ফাঁকি কমানো এবং বিদ্যমান কর কাঠামো আরও কার্যকর করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি দেওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই এসব সুবিধা পর্যালোচনা করে অনেক ক্ষেত্রেই তা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে রাজস্ব আয়ের পরিধি বাড়বে এবং কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।

তবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু খাতে বিশেষ সুবিধা বজায় রাখা হতে পারে বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে গণপরিবহন বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট খাতে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কারণ এই খাতটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহন ও সার্বিক বাজার ব্যবস্থার ওপর।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় আরও জানানো হয়, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স কমিয়ে আনার বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমানো এবং কর প্রদানের প্রক্রিয়াকে সহজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কর ফাঁকি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে কর ফাঁকির কারণে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সভায় ভ্যাট রিফান্ড সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রাপ্য ভ্যাট রিফান্ড পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, প্রায় দেড় বছর ধরে অনেক প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রিফান্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এখন এই জট দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। বিশেষ করে বিমান ও পরিবহন খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি আগাম করের হারও বর্তমানে ১৭ শতাংশ হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনায় চাপ বাড়ছে।

তাদের দাবি, বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের খাতে করের হার তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সেই ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, যা ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আরও বলেন, কর কাঠামো সহজ ও ব্যবসাবান্ধব না হলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বাজেট প্রণয়নের সময় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, প্রাক-বাজেট আলোচনা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনা করে আগামী বাজেট প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামো তৈরি করা।

আসন্ন বাজেটে কর অব্যাহতি সুবিধা কমানো, কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং রাজস্ব আদায়ের নতুন কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *