বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, ভোটের আগে সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার সেসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে এবং অতীতের সব ওয়াদা ভুলে গেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর পীরেরবাগ এলাকায় আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার তাদের দলীয় ৩১ দফা ইশতেহারে সংস্কারের কথা বলেছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল, সরকার গঠন করতে পারলে একটি সংস্কার কমিশন গঠন করে সংবিধানের সেই ধারাগুলো সংশোধন করা হবে, যেগুলো অতীতে সরকারকে ফ্যাসিবাদী করেছে।
কিন্তু বর্তমানে সংস্কারের কথা উঠলেই সরকারি দল বলছে, সংবিধানে এ ধরনের কোনো কথা নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সংবিধানে যদি সংস্কারের কথা না-ই থাকে, তাহলে ৩১ দফায় তা উল্লেখ করা হয়েছিল কেন, গণভোট চাওয়া হয়েছিল কেন এবং জনগণকে আহবান জানানো হয়েছিল কেন? তিনি এসবকে ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি নিজেদের দেওয়া ওয়াদার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং জনগণের রায়কে অস্বীকার ও অপমান করার শামিল।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্পিকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে আলোচনা সমাপ্ত ঘোষণা করেন, যা সংসদীয় ভাষায় ‘টক আউট’ হিসেবে বিবেচিত। এতে তাঁরা মর্মাহত হয়েছেন এবং জাতিও কষ্ট পেয়েছে।
বিএনপি নির্বাচনের আগে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সরকার গঠন করতে পারলে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করবে।
জামায়াত আমির বলেন, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এরই মধ্যে প্রথম কর্মসূচি পালন করা হয়েছে এবং এটি আন্দোলনের শুরু মাত্র। ধীরে ধীরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবি আদায় করা হবে বলেও তিনি অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, দেশে আবার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হোক, এমনটি কেউ চায় না।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্ব কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে এবং বাংলাদেশে জ্বালানিসংকট তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, এই সংকট মোকাবেলায় সরকার খোলামেলা আলোচনা করছে না এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরছে না। জ্বালানিসংকটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজধানীর সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা যাচ্ছে, অনেক স্থানে যানবাহন স্থবির হয়ে আছে এবং মানুষ ঠেলে গাড়ি সরাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বহুদলীয় সংলাপের আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে বসে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ডিজিটাল শিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, একটি শ্রেণিকক্ষে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়ে, সেখানে বাড়িতে আলাদা ডিভাইস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় হবে না। শিশুদের ডিভাইসনির্ভরতা বাড়ানোর ঝুঁকিও এতে রয়েছে। করোনার সময় শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবারও একই ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, তাই এই খাতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন এবং অভিভাবকদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান তিনি।
দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় অতীতে উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে
এদিকে অতীতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রকৌশলীরা জাতির কারিগর। তাঁদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
শুক্রবার রাতে রাজধানীর আল ফালাহ মিলনায়তনে দ্য ফোরাম অব ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টস, বাংলাদেশ (এফইএবি) আয়োজিত এক মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার এবং উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব। একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিদের মেধা ও দেশপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে বিশ্বদরবারে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। এফইএবির সভাপতি প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফার সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এফইএবি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান।


