‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-প্রতিপ্রাদ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬। রোববার সকালে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে চার দিনব্যাপী এই বার্ষিক উৎসব শুরু হবে। সরকারি নির্দেশনায় এবার পুলিশ সপ্তাহে ব্যয় সংকোচনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগে সাত দিনব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকলেও, এবার তা কমিয়ে চার দিনে (১০-১৩ মে) নামিয়ে আনা হয়েছে। আলোকসজ্জা ও আপ্যায়নের আড়ম্বর কমানো হয়েছে। সিভিল সোসাইটির সঙ্গে প্রথাগত মতবিনিময়ের পরিবর্তে এবার প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের ওপর।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির পৃথক বাণী দিয়েছেন। পুলিশ সপ্তাহের গুরুত্ব তুলে ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়কদ্বীপ বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় তদারকি ব্যবস্থার আপডেট দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশের বিভিন্ন কন্টিনজেন্ট ও পতাকাবাহী দলের সুশৃঙ্খল, দৃষ্টিনন্দন ও বর্ণিল প্যারেড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করবেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন।
প্রতিবছরই পুলিশ সপ্তাহে নিজেদের দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করে পুলিশ সদস্যরা। এবার নতুন করে ছয় দফা দাবি নির্ধারণ করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। গত বছর সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হলেও একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। এবারের বার্ষিক পুলিশ প্যারেডে অধিনায়ক হিসাবে নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
মাঠপর্যায়ের পেট্রোলিং ও অপরাধ দমনে সীমিত রিসোর্সের ব্যবহার কীভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া যায়- সেটাই হচ্ছে এবারের ‘পুলিশ দরবারে’ আলোচনার প্রধান বিষয়। কিশোর গ্যাং কালচার, মাদক সিন্ডিকেট এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষ ইউনিটগুলোর নতুন কর্মপরিকল্পনা বিষয়ও সামনে এসেছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা-থানায় গিয়ে যেন কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই জিডি বা মামলা করা যায়।
কয়েকজন পুলিশ সদস্য জানিয়েছে, প্রতিটি সদস্যের কাছে পুলিশ সপ্তাহ একটি অনুপ্রেরণার নাম। তাই এবারের পুলিশ সপ্তাহের স্লোগানটি যেন শুধু ব্যানারেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে এসে পুলিশ বাহিনী যদি সত্যিই জনগণের ‘সেবক’ হিসাবে কাজ শুরু করে, তবেই এই পুলিশ সপ্তাহ সার্থক হবে।
এ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এক বাণীতে বলেন, পুলিশ বাহিনীর সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার ওপর একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে। বিভিন্ন জাতীয় আয়োজন ও ক্রান্তিকালীন সময়েও পুলিশ বাহিনীর নৈর্ব্যক্তিক, পেশাদার ও জনবান্ধব ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনে বাংলাদেশ পুলিশ সততা ও দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা পালন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিস্তারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলছে। তবে ঘরে-বাইরে জনমনে নিরাপত্তা, স্বস্তি না থাকলে লক্ষ্য অর্জন দুরূহ হয়ে উঠবে। এজন্য পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই এই মুহূর্তে আমাদের অগ্রাধিকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বাণীতে বলেন, প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে পেশাদারিত্বের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে মানুষের কাছে সেবা ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে হবে। ভুক্তভোগীকে প্রাপ্য আইনি সেবা পেতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়-সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ পুলিশ যে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও ত্যাগের পরিচয় দিয়ে আসছে, তা প্রশংসার দাবিদার। দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি কার্যকর, আধুনিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনীর বিকল্প নেই।
আইজিপি বাণীতে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে আমরা পুলিশের কার্যক্রমকে আরও জনবান্ধব, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমরা জনগণের পুলিশ হিসাবে তাদের পাশে থেকে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা দিতে চাই।
জানা গেছে, পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের দিন সদস্যদের কল্যাণ প্যারেডে বাহিনীর পক্ষ থেকে ৬ দফা দাবি তুলে ধরা হবে। এগুলো হলো- ১. দেশের সর্বত্র সাইবার সুরক্ষা জোরদার করা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পুলিশে সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠা, ২. কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে একটি পুলিশ মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, ৩. পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে সিলেট এবং বরিশাল বিভাগে দুটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) এবং চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ৪. পুলিশ সদস্যদের সুস্থ দেহ, শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ক্রীড়া সক্ষমতার মান আরও বাড়াতে স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ; ৫. প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; মানব পাচার, নির্যাতন ও বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ব্যবস্থাপনা আরও উন্নীতকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশে বাংলাদেশ মিশন-দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগসহ দুদক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে পুলিশ অফিসারদের পদায়ন; ৬. সাধারণ পুলিশিংয়ের পাশাপাশি দেশে উগ্রবাদ, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত গমনাগমনের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি এভিয়েশন পুলিশ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা।


