ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক স্লাইড

 

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ গতকাল রবিবার ৩০তম দিনে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। এ লক্ষ্যে শনিবার আরো কয়েক হাজার মার্কিন সেনা ওই এলাকায় পৌঁছেছে। এদিকে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অংশগ্রহণে গতকাল থেকে ইসলামাবাদে এক উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে ইরান ও হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলে একযোগে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময় ইসরায়েলের ১০০টির ও বেশি শহরে সতর্কসংকেত বেজে ওঠে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ইসরায়েলও ইরান ও লেবাননে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলের শিল্পাঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বিরসেবা এলাকার শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার একটি রাসায়নিক কারখানায় আগুন লাগার পর বিপজ্জনক রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আশপাশের কর্মীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ওই এলাকায় সাধারণের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। আশপাশের বাসিন্দাদের বাড়ির ভেতরে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দলগুলো সেখানে বিপজ্জনক রাসায়নিক লিক বা ছড়িয়ে পড়া রোধে কাজ করছে।

ইসলামাবাদে চার দেশের আলোচনা শুরু

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে ইসলামাবাদে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনব্যাপী আলোচনা। এরই মধ্যে তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত বন্ধে পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

ইরানে কয়েক সপ্তাহের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন

ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট শনিবার এক প্রতিবেদনে এমনটি জানিয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য এই স্থল অভিযান দেশ দখলের মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন হবে না। বরং বিশেষ কমান্ডো বাহিনী ও সাধারণ পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ঝটিকা হামলা বা ‘রেইড’ চালানো হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা

ইরান যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের নতুন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে শনিবার তিন হাজার ৫০০ সেনা নিয়ে মার্কিন রণতরি ইউএসএস ত্রিপোলি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক পোস্টে এ তথ্য নিশ্চিত করলেও সেনারা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় অবস্থান করবে তা স্পষ্ট করেনি।

গোপনে স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি গালিবাফের

কূটনীতির কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র গোপনে স্থল হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘শত্রুপক্ষ প্রকাশ্যে আলোচনা ও সংলাপের বার্তা দেয়, অথচ গোপনে স্থল হামলার পরিকল্পনা করে। আমাদের যোদ্ধারা মার্কিন সেনাদের স্থল অভিযানের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে তাদের শাস্তি দেওয়া যায়।’

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলা, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত

মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে গত ২৪ ঘণ্টায় দফায় দফায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শনিবার সবচেয়ে বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। আবুধাবিতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম’ (ইজিএ) জানিয়েছে, তাদের প্রধান কারখানায় ভয়াবহ হামলা হয়েছে। এতে স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হয়েছেন। একই সময়ে হামলার শিকার হয়েছে বাহরাইনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন’। সেখানেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

কুয়েতেও বড় হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে চালানো এ হামলায়ও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওমানের দক্ষিণে সালালাহ বন্দরে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। এই হামলায় একজন বিদেশি কর্মী আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের আকাশসীমায় কয়েক ঘণ্টায় ১০টি ড্রোন রুখে দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিবৃতিতে দাবি করেছে।

ইরানের হামলায় মার্কিন বিমান ধ্বংস

সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় একটি মার্কিন ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ বিমান ধ্বংস হয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের বিমান প্রথমবারের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বহুমুখী চাপে ইসরায়েল

যুদ্ধের শুরুতেই লেবাননের হিজবুল্লাহ ইরানের পাশাপাশি ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আসছিল। এবার চলমান যুদ্ধে হুতি বিদ্রোহীর যোগ দেওয়ায় বহুমুখী চাপ সামলাতে হচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ)। আইডিএফ মুখপাত্র নাদাভ শোশানি জানিয়েছেন, তাঁরা হুতিদের হামলাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন। বর্তমানে একটি বহুমুখী যুদ্ধের জন্য আইডিএফ সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তেহরানে বিমান হামলা

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানে ভয়াবহ বোমাবর্ষণের শব্দ শোনা গেছে। তেহরানে অবস্থিত দেশটির অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউএসটি) মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ইরানের শাফত ও বন্দর খামির এলাকায় হামলায় প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুমকি দিয়েছে যে ইরানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার বদলা নিতে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আঘাত হানবে।

ইরানের হুমকির পর অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকির কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু অতিরিক্ত সতর্কতার কারণে এটি সোমবার ও মঙ্গলবার সম্পূর্ণ অনলাইনে পরিচালিত হবে।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত তিন সাংবাদিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শত শত মানুষ

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় শনিবার দায়িত্ব পালনকালে তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। গতকাল স্থানীয় সময় সকালে তাঁদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরের একটি কবরস্থানে শত শত মানুষ উপস্থিত হয়। নিহত তিনজন হলেন—আলী শোয়েব, ফাতিমা ফেতোনি ও মোহাম্মদ ফেতোনি।

সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *