ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ আসলে কী?

আন্তর্জাতিক স্পেশাল

সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ সাত দেশ যুক্ত হচ্ছে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’–এ সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ মোট সাতটি দেশ যোগ দেবে—এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এই দেশগুলোর সঙ্গে আগে থেকেই ইসরায়েল প্রকাশ্যে বোর্ডে যোগ দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন।

তবে এ বিষয়ে পুতিন জানিয়েছেন, রাশিয়া এখনো আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, এই বোর্ডের লক্ষ্য ছিল গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধ করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তদারকি করা। কিন্তু প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নাম নেই, বরং এটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে জাতিসংঘের কিছু ভূমিকার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে—এমন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

তবে সৌদি আরব জানিয়েছে, মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর এই জোট—সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কাতার—গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি জোরদার, পুনর্গঠন সহায়তা এবং তারা যাকে ‘ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তি’ বলছে, সেই লক্ষ্যকে সমর্থন করছে।

সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (দাভোস) বৈঠকে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, পুতিন তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন, তিনি গ্রহণ করেছেন। অনেকেই গ্রহণ করেছেন।’

তবে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, পুতিন দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, আমন্ত্রণটি এখনো বিবেচনাধীন।

তিনি আরো জানান, জব্দ করা রুশ সম্পদ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার জন্য রাশিয়া প্রস্তুত এবং তার মতে এই বোর্ডের কাজ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।

ট্রাম্পের এই নতুন বোর্ডে কয়টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কানাডা ও যুক্তরাজ্য আমন্ত্রিত হলেও এখনো প্রকাশ্যে সাড়া দেয়নি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মরক্কো ও ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে।

বুধবার ভ্যাটিকান নিশ্চিত করেছে, পোপ লিও আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

ভ্যাটিকানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন বলেন, বোর্ডে যোগ দেবেন কি না—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পোপের সময় প্রয়োজন।

অন্যদিকে স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলোব জানিয়েছেন, তিনি আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, এই বোর্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিপজ্জনকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

ফাঁস হওয়া এক নথিতে বলা হয়েছে, তিনটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সনদে সম্মতি দিলেই ‘বোর্ড অব পিস’ কার্যকর হবে। সদস্যদের মেয়াদ হবে তিন বছর, যা নবায়নযোগ্য। আর ১ বিলিয়ন ডলার দিলে স্থায়ী আসন পাওয়া যাবে।

সনদে বোর্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হবেন। তার হাতে নির্বাহী বোর্ড সদস্য নিয়োগ এবং অধীনস্থ সংস্থা গঠন বা বিলুপ্ত করার ক্ষমতাও থাকবে।

গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের সাত সদস্যের নাম ঘোষণা করে। এর মধ্যে আছেন—যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।

জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভকে পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজায় বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ধাপে পুনর্গঠন ও নিরস্ত্রীকরণ অন্তর্ভুক্ত আছে। পরিকল্পনাটি ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে চলবে।

তবে শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, গাজা নির্বাহী বোর্ডের গঠন ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই করা হয়েছে, যা তাদের নীতির বিরুদ্ধে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে না জানিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই দুই দেশ মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে গত অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছিল।

শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে, হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর আওতায় গাজায় থাকা জীবিত ও মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, আংশিক ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইসরায়েল জানিয়েছে, হামাস শেষ নিহত জিম্মির মরদেহ হস্তান্তর না করলে তারা দ্বিতীয় ধাপে যাবে না। দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে বড় বাধা রয়েছে। হামাস আগে জানিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া তারা অস্ত্র ছাড়বে না। অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো গাজা থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

এ ছাড়া যুদ্ধবিরতিও এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলি হামলায় ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, একই সময়ে ফিলিস্তিনি হামলায় তাদের তিন সেনা নিহত হয়েছে।

এই যুদ্ধের সূচনা হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

‘বোর্ড অব পিস’ কী

ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট একটি নতুন আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পর থেকেই বিষয়টি ঘিরে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

এই সংস্থার নির্বাহী বোর্ডে রাখা হয়েছে বেশ কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তিকে। তাদের মধ্যে আছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যিনি ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার অন্তর্ভুক্তি নিয়েই শুরু হয়েছে সমালোচনা। এ ছাড়া সংস্থাটির স্থায়ী সদস্য হতে এক বিলিয়ন ডলার ফি নির্ধারণ, এর ক্ষমতা ও ভূমিকা জাতিসংঘের কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে কি না, এবং পুরো কাঠামোর স্বচ্ছতা—এসব বিষয় নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। সব মিলিয়ে, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই নতুন সংস্থাটি শান্তির উদ্যোগ না হয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকেরা।

এটি এমন এক উদ্যোগ যা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও কাজ করবে। শুরুতে বলা হয়েছিল, গাজা উপত্যকায় শাসন কাঠামো পরিচালনার জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি উদ্যোগটির একটি নথি হাতে পেয়েছে মিডল ইস্ট আই। সেখানে ফিলিস্তিন বিষয়ক তথ্য উল্লেখ নেই। বরং আন্তর্জাতিক শান্তি স্থাপনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

নথিতে বলা হয়েছে, ‘বোর্ড অব পিস একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। যা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, নির্ভরযোগ্যতা ও আইনের শাসন পুনপ্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতে কাজ করবে।’ এতে আরো বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তি তখনই কার্যকর হবে যখন কোনো কিছুর বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন, সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সমাধান করা হবে।’ বোর্ড অব পিসের চেয়ারম্যান হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্তৃত ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তার হাতে কোনো দেশকে সদস্য করা কিংবা অপসারণের ক্ষমতা থাকবে। বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্ত তখনই বাতিল হবে, যখন দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য বিরুদ্ধে ভোট দেবেন। প্রথম বছরে ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার মাধ্যমে কোনো দেশ ৩ বছরের জন্য বোর্ডের সদস্য হতে পারবে।

বোর্ডে যোগদানের জন্য কী কী প্রয়োজন?

একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, বোর্ডে যোগদানের বাধ্যবাধকতা নেই – তবে যারা কেবল তিন বছরের সদস্যপদ থাকার পরিবর্তে স্থায়ী সদস্য হতে চান, তাদেরকে এক বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হবে।

কর্মকর্তারা আরো জানান, এই অর্থ গাজার পুনর্গঠনে তহবিল যোগাতে সহায়তা করবে। তবে রয়টার্স সংবাদ সংস্থার দেখা চিঠি ও খসড়া সনদের একটি অনুলিপি অনুসারে, এই বোর্ড, যেটিতে ট্রাম্প আজীবন সভাপতিত্ব করবেন, অন্যান্য সংঘাত মোকাবেলায় পরবর্তীতে আরো সম্প্রসারিত হবে।

সূত্র : বিবিসি, বিবিসি বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *